প্রভাষক
০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ০৮:০৫ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় পরিচালনা কমিটি থাকলেও কার্যত এখন এ ধরনের কমিটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির নামে ক্ষেত্রবিশেষে দায়িত্বপ্রাপ্তদের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। যদিও কমিটি প্রথার শুরুই হয়েছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় জমি, শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সব নিশ্চিত করা। দানশীলরাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানাতেই আর তারাই পরিচালনা করতেন। কিন্তু আয় ছাড়াও গত প্রায় দুই দশক ধরে এক শ্রেণির আমলা ও রাজনীতিকের প্রভাব নিশ্চিন্তকরণের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই কমিটিকে। কমিটির সভাপতির হাতে শিক্ষকরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক সময় বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে কোনো বেতন পেতেন না। পরবর্তী সময়ে এমপিও প্রথা চালুর মাধ্যমে কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা পাওয়া শুরু করেন। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে টিউশন ফিসহ অন্যান্যখাতের আয় দিয়েও তাদের বেতন-ভাতা নেয়া অব্যাহত থাকে। তবে, সব প্রতিষ্ঠানের আয় সমান নয়। প্রতিষ্ঠানের আয় কোষাগারে জমা দেয়ার শর্তে ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাস থেকে সরকার কোষাগার থেকে মূল বেতন স্কেলের শতভাগ দেয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরিচালনা কমিটি ও কতিপয় মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমিতির কতিপয় শিক্ষক নেতার বিরোধিতায় প্রতিষ্ঠানের আয় কোষাগারে জমা বিধান বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। পরে ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার শতভাগ বেতন-ভাতা কোষাগার থেকে দেয়া শুরু করে। তবে, বেসরকারি রেজিস্ট্রার্ড ও কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এই ঘোষণা ও বেতন-ভাতা সুবিধার আওতায় আসেনি। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে সরকার এক ঘোষণায় সব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করে।
শুধু বেতন-ভাতাই নয়, মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের খরচই বহন করে সরকার। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চসহ সব আসবাবপত্র, শিক্ষা উপকরণ, নতুন ভবন তৈরি, ভবন সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের খরচ সবই বহন করে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের বড় অংশটিই ব্যয় হয় এসব খাতে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে অযাচিত খবরদারির দায়িত্ব পরিচালনা কমিটির। সরকারি অর্থে প্রতিষ্ঠানের সবকিছু চললেও সরকারের হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই। শিক্ষকরা বলছেন, যখন সরকার পুরো বেতন-ভাতা দিত না তখন শিক্ষকদের বেতনের টাকা সংগ্রহ করে দেবার জন্য কমিটির দরকার ছিল। চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কিনে দিতে হতো। তবে এখন আর এর দরকার কী?
সাবেক শিক্ষাসচিব ও বাংলাদেশ মজুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের কমিটির কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা আছে। ম্যানেজিং কমিটি-গভর্নিং বডির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নানা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। তিনি বলেছেন, সময় এসেছে নতুন করে ভাবার।
বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি শাহীনুর আল আমিন দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, এখন সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ই সরকারি। শিক্ষক নিয়োগ পুরোটাই সরকারের হাতে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকার ফি বছর স্লিপসহ নানাখাতে টাকা বরাদ্দ দেয়। আর এসব টাকার প্রতি নজর পরিচালনা কমিটির, বিশেষ করে সভাপতিদের।
শুধু ম্যানেজিং কমিটিই নয়, প্রতিষ্ঠানের টাকা-পয়সা জমিজমা লুটপাটে জড়িত থাকেন তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও। উদাহরণ হিসেবে শাহীনুর আল আমিন বলেন, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া ইউনিয়নের পূর্ব পশারিবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি টিনশেড ঘর দখল করে ব্যবসা শুরু করেছেন স্কুলটির সভাপতির ছেলে।
জানা যায়, বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে থাকে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) ও কলেজ এবং সমমানের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকে গভর্নিং বডি (জিবি)।
মাধ্যমিক ও তদূধর্ব প্রতিষ্ঠানের প্রবিধানমালা অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির ১৬টি দায়িত্ব পালনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে: প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি, ভবন, খেলার মাঠ, বই, ল্যাবরেটরি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা। প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা। ডোনেশন সংগ্রহ, শিক্ষক নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ, বার্ষিক বাজেট অনুমোদন ও উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন, ছাত্রছাত্রীদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের আবেদন মঞ্জুরি, ছুটির তালিকা অনুমোদন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান ও স্টাফদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক তহবিল গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্কুলের সম্পত্তির কাস্টোডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রদান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের নিয়ে প্রি-সেশন সম্মেলনের ব্যবস্থা করা।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে অধিকাংশ পরিচালনা পর্ষদই এসব কাজের একটিও করেন না। বরং প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন নামে টাকা লুটপাট করে তহবিল শূন্য করার বহু উদাহরণ রয়েছে। সংস্কারের কোনো কাজ না করেই টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়।
বর্তমানে সহকারী শিক্ষক ও প্রভাষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষকে (এনটিআরসিএ) দেয়া হলেও প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও কর্মচারী পদে আগের মতোই বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এসএমসি ও জিবির বিরুদ্ধে।
এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। এই অধিদপ্তরের ১০০টি তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এর মধ্যে অন্তত ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের মূল কারণ গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, ‘পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া গেলে ঐ কমিটি ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার বোর্ডের আছে।’
অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান বলেন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কমিটি ছাড়া পরিচালিত হতে পারলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের টাকার পরিচলিত হতে কেনো কমিটির প্রয়োজন আছে কী। এ শিক্ষাবিদের মতে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আর্থিক বিষয়গুলো তদারকি করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন। ‘ফায়দা লোটার জন্য এসে শিক্ষকদের সঙ্গে ঝগড়া ফ্যাসাদ বাধানোর লোকের প্রয়োজনীয়তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই।’
তিনি বলেন, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, খুলনা বিএল কলেজসহ সারা দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে চলছে, সে একই নিয়মে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে।