Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

১৩ জানুয়ারি, ২০১৪ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বনবী (সাঃ) এর মিরাজ ।

আলিম ১ম বর্ষ,ইসলামের ইতিহাস ।

তায়েফ থেকে ফিরে আসা, তাদের রুঢ় ও অমানবিক আচরণ এবং আবু তালিব ও খাদিজার মৃত্যুর পর কুরাইশের অত্যাচার বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে একাধিক চিন্তা একত্রিত হয়। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে শোকাহত ও দুঃখে কাতর নবীর সান্তনা আসে।

নবুওয়াতের ১০ম সালে রজবের ২৭ তারিখের রাতে তিনি যখন নিদ্রারত ছিলেন, জিবরাঈল বুরাক নিয়ে আসেন। বোরাক ঘোড়া সদৃশ এক জন্তু যার দু’টি দ্রুতমান পাখা আছে বিদ্যুতের ন্যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম  কে তাতে আরোহণ করানো হয় এবং জিবরাঈল তাকে ফিলিস্তীনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথমে নিয়ে যান। অতঃপর সেখান থেকে আসামান পর্যন্ত নিয়ে যান। এ ভ্রমনে তিনি পালনকর্তার বড় বড় নিদর্শন পরিদর্শন করেন।  বিভিন্ন আকাশে অতীতের নবীদের সঙ্গে মুহাম্মাদুর রাসুলল্লাহ (সা) সাক্ষাৎ ঘটে। আল্লাহর রাসূল (রা) জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। এই ভ্রমণকালেই উম্মাহর জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াকত ও পরে পাঁচ ওয়াকত ছালাত ফরয করা হয়।
মিরাজের সত্যতা ঘোষণা করে নাযিল হয় সূরা বনী ইসরাইল। এই সূরাতে ইসলামী সমাজ গঠনের জন্যে নীতিমালা পরিবেশিত হয়।
সে নীতিমালা হচ্ছে:
o আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না।
o আব্বা-আম্মার প্রতি সদাচরণ করবে।
o আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন ও মুসাফিরের হক আদায় করবে।
o অপচয় ও অপব্যয় করবে না।
o মিতব্যয়ী হবে।
o অভাবের ভয়ে সন্তান হত্যা করবে না।
o যিনার নিকটবর্তী হবে না।
o কাউকে হত্যা করবে না।
o ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না।
o ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।
o মাপ ও ওজনে ফাঁকি দেবে না।
o যেই বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই (গুজব) তার পেছনে ছুটবে না।
o গর্বভরে চলাফেরা করবে না।

তিনি একই রাত্রে তুষ্ট মন ও সুদৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে মক্কায় প্রত্যাগমন করেন। ভোর বেলায় কাবা শরিফে গিয়ে তিনি লোকদেরকে একথা শুনালে কাফেরদের মিথ্যার অভিযোগ ও ঠাট্রা বিদ্রুপ আরোপ বেড়ে যায়। উপস্থিত কয়েক জন লোক তাঁকে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিবরণ দিতে বলে। মূলত উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে অপারগ ও অক্ষম প্রমাণিত করা। তিনি তন্ন তন্ন করে সব কিছু বলতে লাগলেন। কাফেররা এতে ক্ষান্ত না হয়ে বলে,  আমরা আর একটি প্রমাণ চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি পথে মক্কাগামী একটি কাফেলার সাক্ষাৎ পাই এবং তিনি কাফেলার বিস্তারিত বিবরণসহ উটের সংখ্যা ও আগমনের সময়ও বলে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যই বলেছেন কিন্তু কাফেররা হটকারিতা, কুফর ও সত্যকে অস্বীকার করার দরুণ ভ্রান্ত রয়ে গেল। সকাল বেলায় জিবরাঈল এসে রাসূলকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পদ্ধতি ও সময়সুচী শিখিয়ে দিলেন। ইতিপূর্বে নামায শুধু সকাল বেলায় দু’রাকআত ও বিকেল বলায় দু’রাকআত ছিলো। কুরাইশরা সত্য অস্বীকার করতে থাকায় এ দিনগুলোতে তিনি মক্কায় আগমণকারী ব্যক্তিদের মাঝে দাওয়াতী তৎপরতা চালাতে লাগলেন। তিনি তাদের অবস্থান স্থলে মিলিত হয়ে দাওয়াত পেশ করতেন এবং তাঁর সুন্দর ব্যাখ্যা দিতেন। আবু লাহাব তাঁর পিছনে তো লেগেই থাকতো। সে লোকদেরকে তাঁর থেকে ও তাঁর দাওয়াত থেকে সতর্ক থাকতে বলতো। এক বার ইয়াসরিব থেকে আগত এক দলকে ইসলামের আহবান জানালে তাঁরা মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং তাঁর অনুসরণ  ও  তাঁর প্রতি ঈমান আনতে ঐক্যবদ্ধ হয়। ইয়াসরিববাসী ইয়াহূদীদের কাছে  শুনতো যে অদূর ভবিষ্যতে একনবী প্রেরিত হবেন। তাঁর আবির্ভাবের যুগ নিকটে এসে গেছে। তাদেরকে যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত দেন, তাঁরা বুঝতে পারলো যে তিনি সেই নবী যার কথা ইয়াহূদীরা বলেছে।  তাঁরা সত্ত্বর ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে এবং বলে ইয়াহূদীরা যেন আমাদের অগ্রগামী না হয়। তাঁরা ছিল ৬ জন, পরবর্তী বছর ১২ জন আসে। তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৌলিক শিক্ষা দেন। প্রত্যাবর্তনের সময় তাদের সাথে তিনি মুসআব বিন উমাইরকে কুরআন ও দ্বীনের বিধানাবলী শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠান। মুসআব মদিনায় বিরাট প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। এক বছর পর তিনি যখন মদিনায় আসেন, তখন তাঁর সাথে ৭২ জন পুরুষ ও দু’জন মহিলা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মিলিত হন এবং তাঁরা দ্বীনের সহযোগিতা ও এর প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। অতঃপর তাঁরা মদিনায় ফিরে যান।

মিরাজ সম্পর্কিত আবুবকর (রাঃ)-এর ঐতিহাসিক এবং শিহ্মনীয় ঘটনা

আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

রাসূল (সাঃ) মিরাজ থেকে ফিরে এসেছেন। সকালবেলা তিনি যখন মক্কার কুরাইশদের মিরাজের ঘটনাটি বললেন তখন কুফ্ফার সম্প্রদায় হাসি-তামাশায় লিপ্ত হয়েছিল। মক্কার এই কুরাইশ সম্প্রদায়ের কুফ্ফারগণ ছিলেন অনেকটা বস্তুবাদি। যা দেখা, যায় ধরা যায়, ছোয়া যায় শুধু তাই তারা আমলে নিত। রাসূল সা: এর মিরাজের ঘটনাটিকে তারা একটা হাতিয়ার হিসেবে ধরে নিল আর এর মাধ্যমে মিরাজের ঘটনাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইল। কুফ্ফার সম্প্রদায়ের কিছু লোক আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর নিকট গেলেন। তিনি বাণিজ্য থেকে কিছুক্ষণ আগে ফিরে এসেছেন, তাই তখনও রাসূল সা: এর সাথে দেখা করতে পারেননি। কুফ্ফার সম্প্রদায় তাকে বলল, শুনেছ কি তোমার সঙ্গী কি সব বলা শুরু করেছে? সে বলছে, সে নাকি এক রাতের মধ্যে মক্কা থেকে বাইতুল মাকদাস(জেরুজালেম) যেয়ে আবার মক্কায় ফিরে এসেছে।
আবু বকর (রা) বললেন, এই কথাগুলো কি তিনি বলেছেন?
তারা জবাব দিল, হ্যাঁ।
এরপর আবু বকর (রা) বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, যদি সত্যিই তিনি  বলে থাকেন, তাহলে তিনি সত্য বলেছেন
কুফফার সম্প্রদায়ের বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল। তারা বলল, তুমি বিশ্বাস কর সে বৃহত্তর সিরিয়ায় যেয়ে আবার এক রাতের মধ্যে ফিরে এসেছে!
আবু বকর (রা) বললেন, আমি তাকে বিশ্বাস করি বরং এর চেয়েও বেশী বিশ্বাস করি ঐসব বিষয়ে যেগুলো তাঁর নিকট ওহী হিসেবে এসেছে।

শিহ্মাঃ

যেহেতু ঘটনাটি অবিশ্বাস্য এবং অলৌকিক। সাধারনভাবে ঘটনাটি বিশ্বাস করা কঠিন। কাজেই এরকম পরিস্হিতিতে যে কেউ নিচের যেকোন একটি কাজ করতে পারেঃ

১. ঘটনাটি বুঝে আসছে না বলে অবিশ্বাস করা।

২. ঘটনাটি বুঝে আসছে না বলে এর উপর নিজস্ব/মনুষ্য বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে অন্য একটা অবস্হান নেয়া। যেমনঃ এহ্মেত্রে তিনি ধরে নিতে পারতেন ঘটনাটি যেহেতু অবিশ্বাস্য তাই এটি স্বপ্নে ঘটেছে বা অন্য কিছু। এবং এভাবে তিনি কাফেরদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারতেন।

৩. ঘটনাটা রাসুল (সাঃ) থেকে এসেছে কিনা যাচাই করে/নিশ্চিত হয়ে এর উপর হুবহু বিশ্বাস স্হাপন করা। অর্থাত ঘটনাটা যেভাবে রাসুল (সাঃ) থেকে এসেছে সেভাবেই মেনে নেওয়া, সেটা বুঝে আসুক আর নাই আসুক।

আবু বকর (রা) তৃতীয় কাজটি করলেন যা আমাদের ঈমানী দ্বায়িত্ব এবং কালেমার সাহ্ম দেবার দাবী।– হাদীস বিশেষজ্ঞগণ এই পদ্ধতীতে কাজ করেন, অর্থাত্্  যদি উৎস সত্যিই রাসূল সা: এর নিকট থেকে আসে- দ্বিতীয়ত, তাহলে তা সত্য। সেটা হচ্ছে ওহী, আল্লাহর নিকট থেকে রাসূল এর উপর নাযিলকৃত। অর্থাৎ সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে তার উপর সেভাবেই বিশ্বাস স্থাপন করা, সেই অনুযায়ী কর্তব্য পালন করা ঈমানী দায়িত্ব, কারণ সেটা ওহী। এমন কথা বলা যাবে না যে, এটা তো আমার যুক্তিতে টিকল না বা আমার বাপ-দাদাদের কখনও এমন কিছু বলতে বা করতে দেখিনি কিংবা আমার ওস্তাদ তো এমনটি করে না’।

আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর এই ঘটনা থেকে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এটাই, রাসূল সা: এর কথা সহীহভাবে আমাদের নিকট পৌছালে বিনা বাক্য ব্যয়ে তা মেনে নিতে হবে, তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কর্ম পালন করতে হবে। সেটা আমার নিকট যুক্তিতে টিকুক আর না টিকুক, আমার চারপাশে লোকজন সেটা মানুক আর না মানুক আমাকে রাসূল সা: এর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করতেই হবে এবং তার যথাসাধ্য অনুসরণ করতে হবে।

একটি সহীহ হাদীস লহ্ম করি
ইবনু শিহাব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, সালেম ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) তাকে (ইবনে শিহাব) বলেছেন, তিনি [সালেম ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ)] শামের একজন লোকের নিকট থেকে শুনেছেন, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ)-কে হজ্জে তামাত্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বললেন, তা হালাল। তখন সিরীয় লোকটি বললেন, তোমার পিতা (ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব) তা নিষেধ করেছেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বললেন, যে কাজ আমার পিতা নিষেধ করেছেন সে কাজ যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পালন করেন, তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ অনুসরণযোগ্য, না আমার বাবার নির্দেশ অনুসরণযোগ্য? লোকটি বললেন, বরং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ অনুসরণযোগ্য। তখন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হজ্জে তামাত্তু আদায় করেছেন। (তিরমিযী, হা/৮২৪, ‘হজ্জ’ অধ্যায়, ‘হজ্জে তামাত্তু সম্পর্কে যা এসেছে’ অনুচ্ছেদ, সনদ ছহীহ।)

আল্লাহ তাআলা আমাদের রাসূল সা: এর সাহাবীদের মতো করে দ্বীন ইসলামকে বুঝার তৌফিক দান করুন এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট