প্রধান শিক্ষক
০৬ ডিসেম্বর, ২০১৩ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
সম্পদ,ঐশ্বর্য আর সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ রহস্যময়ী দ্বীপ নিঝুম দ্বীপ:
সম্পদ,ঐশ্বর্য আর সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ বঙ্গোবাসাগরে নোয়াখালী উপকূলে জেগে ওঠা একটি রহস্যময়ী দ্বীপ নিঝুম দ্বীপ। শুধু বাংলাদেশ নয়, বহির্বিশ্বেরও এ দ্বীপটি নিয়ে মানুষের কৌতুহল রয়েছে। যেমন কৌতুহল দ্বীপ টির নাম নিয়ে, ঠিক তেমনি এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, অবস্থান, অধিবাসীদের জীবন যাত্রা নিয়ে। এর ভৌগোলিক গুরুত্ব নিয়ে বেড়েই চলেছে ভ্রমণ প্রিয় মানুষের কৌতুহল ও জানার আকাংখা। মূলত নোয়াখালী হাতিয়া উপজেলার একটি উপ দ্বীপ হচ্ছে নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ৬৩ বর্গমাইল আয়তনের এ দ্বীপটি হাতিয়ার মূল ভূখন্ড থেকে ৬০ মাইল দক্ষিনে অবস্থিত। সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ দ্বীপটি ১-৬ ফুট উঁচু। দ্বীপের তিন দিকে আরো নতুন নতুন চর জেগে উঠেছে। পুরো দ্বীপটি একটি খাল দ্বারা প্রধানত দু ভাগে বিভক্ত। এর একটির নাম চর ওছমান বা বাল্লার চর। আর অন্যটির নাম চর কমলা। দূর থেকে নিঝুম দ্বীপটিকে দেখতে মনে হয় যেন একটি ভিন্ন গ্রহ।
সৌরজগতের গ্রহগুলো যেমন একটি অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন, মাঝে বিশাল শূন্যতা, ঠিক তেমনি বিশাল জলরাশির মধ্যে বিচ্ছিন্ন একটি ভূখন্ড নিঝুম দ্বীপ। পুরো দ্বীপে সবুজের সমারোহ। ঘন সবুজের বন, মাঝে মধ্যে খাল,বিল,খালের উপর গাছের সাঁকো আর বনের মাঝখানে সবুজ সমতল ভূমি। তার মাঝে তাঁবুর মতো সারি সারি বাড়ি ঘর দ্বীটিকে স্বপ্নে আঁকা ছবির চেয়ে আরোও সুন্দর করে তুলেছে। বন বিভাগ দ্বীপটিতে বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব বনের অধিকাংশ গাছ হচ্ছে কেওড়া বনে হরিণ আর বানর সহ নানা রকম পশু-পাখির বসবাস। দ্বীপের দক্ষিনে বৃত্তাকারে প্রায় ১২ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে বিশাল সি-বিচ। চিক চিকে মোটা বালুকায় সৈকত ঢালু হয়ে চলে গেছে সমুদ্রের গভীরে। ভাটার সময় জেগে ওঠে দীর্ঘ বেলাভূমি। সে বেলাভূমিতে সাগরের ফেনিল উর্মিমালা আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য কাউকে আলোড়িত না করে পারে না। চন্দ্রালোকে জোয়ার-ভাটায় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি করে।এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ম্যাস গ্র“প গড়ে তুলেছে ভ্রাম্যমাণ পিকনিক স্পট ও বিনোদন আবাস। দ্বীপের দক্ষিন প্রান্তে একই জায়গা থেকে অবলোকন করা যায় সর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বিরল দৃশ্য।
নিঝুমদ্বীপের আনুমানিক বয়স ১০০ বছর হলেও ১৯৪০ এর দশক থেকে এখানে মানুষের পদচারণা শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে হাতিয়ায় তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বনমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম কালাম উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা এবং দেশি-বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে দ্বীপটির সবুজে ঘেরা শান্ত-স্নিগ্ধ রূপ দেখে এর নামকরণ করেন নিঝুম দ্বীপ। তখন থেকে দ্বীপটি নিঝুম দ্বীপ হিসেবে স্থায়ী নাম ধারণ করে এবং এ নামে পরিচিতি অর্জন করে। ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায় বর্তমানে নিঝুমদ্বীপের ভোটার সংখ্যা ৬ হাজার ৩ শত আর লোক সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার । কারন প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক জন এসে এখানে বসতি স্থাপন করছে।
নিঝুম দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো এ বিশাল শান্ত-স্নিগ্ধ গভীর ঘন বন। বনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই গভীর ঘন বনে আবৃত। স্বাধীনতার পর থেকে বন বিভাগ এখানে বন সৃজন করে আসছে। গভীর সমুদ্রের জল হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন মাটিতে বাইন ও কেওড়া গাছ লাগানো হয়েছে। নতুন চরে মাটিতে এগাছ গুলো বেশ উপযোগী। নিঝূম দ্বীপের গহিন অরণ্যে রয়েছে প্রায় ৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির পাখি ও ১৬ প্রজাতির সাপ। বনজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে ২১প্রজাতির ও৮৩ প্রজাতির গুল্ম নিঝুম দ্বীপের সবুজ আচ্ছাদনের যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এ দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার হরিণ রয়েছে। শিতের সময় লাখ লাখ অতিথি পাখি এসে এ দ্বীপে এসে আশ্রয় নেয়। এসময় পাখিদের ডাকে পুরো দ্বীপ মুখরিত হয়ে ওঠে। বঙ্গোবাসাগর থেকে নিঝুম দ্বীপের দিকে তাকালে চোখে পড়ে পাখিরা দল বেঁধে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। নিঝুম দ্বীপের পশু-পাখিদের সঙ্গে রয়েছে দ্বীপ বাসীর এক সাধারণ সম্পর্ক। এ দ্বীপের কোন মানুষ পশু-পাখি শিকার করে না। কিন্তু বাহির থেকে কেউ এখানে এসে পশু পাখি শিকার করতে পারেনা। কাছ থেকে দেখা যায়। নিঝুম দ্বীপের পর্যটকদের সবচেয়ে আকৃষ্ট করে এখানকার হরিণ গুলো। খালের মধ্য দিয়ে দ্বীপে প্রবেশের সময় দুই ধারে গভীর বনে তাকালে চোখে পড়ে হরিণের দল। বিশেষ বিশেষ সময় হরিন গুলো নদীতে পানি খেতে আসে। তখন নদীতে ট্রলারে বসে এক সঙ্গে অনেক গুলো হরিণ দেখা অনেকটা সহজ হয়ে। সমগ্র নিঝুম দ্বীপটি হাতিয়া উপজেলার একটি নবগঠিত ইউনিয়ন। বর্তমানে আইন শৃংখলা রক্ষার্থে এখানে একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। দ্বীপের মধ্যে একটু আধটু মনোমালিন্য ছাড়া দ্বীপের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যান্ত শান্ত। দ্বীপের মধ্যে ছোট খাট ৪ টি বাজার রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ৪টি ঘূর্নিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর দ্বীপের কৃষক, মজুর জেলেদের আড্ডায় বাজারের মুড়ি গোল্লা, জিলাপি তৈরির ধুম পড়ে যায়।
দ্বীপের পর্যাটন সম্ভাবনা: একটি আকর্ষণীয় লাভজনক পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে নিঝুম দ্বীপে রয়েছে সোনালী সম্ভাবনা। সমুদ্রের ডাক শুনতে মানুষ ছুটে যায় কক্সবাজারে। টেকনাফ এবং সম্প্রতিক সময়ে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। অথচ নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপের বিস্তীর্ণ সমুদ্রতট ও তার মায়াবী হাত ছানি এখনো অনেকের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। অদ্ভুত এক নির্জনতা নিঝুম দ্বীপকে ঘিরে রেখেছে। এ সৈকতে দাঁড়ালে গভীর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা শব্দ শোনা যায়। বেড়াতে চাইলে নিঝুম দ্বীপই হচ্ছে আদর্শ স্থান। দ্বীপের দক্ষিণে বৃত্তাকার প্রায় বার কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে বিশাল সি-বিচ। চিক চিকে মোটা বালুকাময় এ সৈকত ঢালু হয়ে চলে গেছে গভীর সমুদ্রে। নিঝুম দ্বীপকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। অনেকের ধারনা নিঝুম দ্বীপের বালুকায় কোন অবকাঠামো গড়ে তুললে সমুদ্রের জোয়ারে তা ভেঙ্গে পড়তে পারে। বেসরকারী ২টি প্রতিষ্ঠান ২টি পরিপূর্ণ আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় ফেব্রিকেটেড কটেজ নির্মাণ করে পর্যটন মৌসুমে আবাসনের ব্যবস্থা করে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে এর ভেতরে ছোট ছোট চ্যানেলে পর্যটকদের দৃশ্য অবলোকনের জন্য ব্যবস্থা করতে পারে। যে ভাবে দেশি বিদেশী বিভিন্ন পর্যটক নিঝুম দ্বীপের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে তাতে এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে উঠতে পারে আকর্ষনীয় পর্যটন জোন। আর এ থেকে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে। শীতের মৌসুমই হচ্ছে নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময়। কেননা এ সময় সাগর শান্ত থাকে।
— with Dilruba Khanom, Oskhali Aliya Model Gov’t Primary School
Hatiya – Noakhali.
৭০
১৪৪ মন্তব্য