সহকারী শিক্ষক
৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শতবর্ষের আলোকবর্তিকা: ঐতিহ্যবাহী কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয়
ভূমিকা শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, আর একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো সেই মেরুদণ্ড গড়ে তোলার প্রধান কারিগর। বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলায় অবস্থিত ‘কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয়’ তেমনি এক গৌরবময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে আসা এই বিদ্যালয়টি কেবল ইট-পাথরের কোনো ভবন নয়, বরং অত্র অঞ্চলের কয়েক প্রজন্মের মানুষ গড়ার এক জীবন্ত ইতিহাস। ১৯১৩ সালে যাত্রা শুরু করে আজ অবধি এই বিদ্যাপীঠটি জ্ঞানের অনির্বাণ শিখা জ্বালিয়ে আলোকিত করে চলেছে কৈলাইন, তুলপাইসহ আশেপাশের অসংখ্য গ্রাম ও জনপদকে।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও শতবর্ষের ইতিহাস বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯১৩ সালের ১ জানুয়ারি কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময়ে প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী ও সাহসী পদক্ষেপ। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ, সমাজসেবক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ত্যাগের ফসল হিসেবে এই বিদ্যাপীঠটি মাথা তুলে দাঁড়ায়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৫৫ সালের ৪ জানুয়ারি বিদ্যালয়টি তৎকালীন সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। ব্রিটিশ আমল, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলার প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে এই বিদ্যালয়টি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শত শত মেধাবী শিক্ষার্থী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এর প্রাঙ্গণ।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অবস্থান কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার কৈলাইন গ্রামের এক মনোরম ও ছায়াঘেরা গ্রামীণ পরিবেশে বিদ্যালয়টি অবস্থিত। কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশ, সামনে বিস্তৃত খেলার মাঠ এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি শিক্ষার্থীদের পাঠগ্রহণের জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীদের কলকাকলি আর জাতীয় সঙ্গীতের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে বিদ্যালয়ের পুরো আঙিনা।
একাডেমিক কার্যক্রম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে নবম ও দশম শ্রেণিতে চালু রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ—বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ: শিক্ষার্থীদের আধুনিক বাণিজ্যিক বিশ্ব, হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং এবং ব্যবসায় উদ্যোগের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এই বিভাগটি অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করছে।
বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগ: তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক রতন কুমার পাল এবং একদল দক্ষ, অভিজ্ঞ ও আন্তরিক শিক্ষকবৃন্দের নিবিড় তত্ত্বাবধানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পরিচালিত হয়। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী উদাহরণের মাধ্যমে পাঠকে আনন্দদায়ক করে তোলাই এখানকার শিক্ষকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সহশিক্ষা কার্যক্রম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয়ের রয়েছে সমৃদ্ধ সহশিক্ষা কার্যক্রম। নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও বাংলা নববর্ষের মতো জাতীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো অত্যন্ত মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সহায়তা করে।
গৌরবময় অর্জন ও সমাজ গঠনে ভূমিকা কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে (জেএসসি ও এসএসসি) কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল বরাবরই প্রশংসনীয়। প্রতি বছরই এখান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যায়। এই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী আজ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে—প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সমাজসেবায়—নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। নারী শিক্ষার প্রসার এবং গ্রামীণ জনপদে কুসংস্কার দূর করে আধুনিক সমাজ গঠনে এই বিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য।
উপসংহার শতবর্ষের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে কৈলাইন তুলপাই উচ্চ বিদ্যালয় আজও তার গৌরবময় যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে বিদ্যালয়টি আগামী দিনের সুনাগরিক গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঐতিহ্য, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার যে আলোকবর্তিকা ১৯১৩ সালে প্রজ্বলিত হয়েছিল, তা আগামীতেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।
১
২ মন্তব্য