সহকারী শিক্ষক
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:১৬ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মোহাম্মদ হাছান স্যার—যাঁর কণ্ঠে ইতিহাস হয়ে উঠত জীবন্ত
জনাব মোহাম্মদ হাছান। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ‘হাছান স্যার’ নামেই পরিচিত। তিনি কলাউজান শাহ্ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার ইতিহাস বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।
তিনি ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের মল্লিক ছোয়াং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল বারী এবং মাতা মরিয়ম খাতুন।
তিনি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর মকবুলিয়া কামিল মাদরাসা থেকে ১৯৮৪ সালে দাখিল, ১৯৮৬ সালে আলিম এবং ১৯৮৮ সালে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসা থেকে ১৯৯০ সালে হাদিস বিভাগে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
মোহাম্মদ হাছান স্যার ১৯৯৭ সালের ১৪ অক্টোবর কলাউজান শাহ্ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসায় ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা করে আসছেন। বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর বিশেষত্ব হলো বিষয়ভিত্তিক গভীর জ্ঞান, সাবলীল উপস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সহজভাবে পাঠ বুঝিয়ে দেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা। ইতিহাসের মতো বিস্তৃত বিষয়কে শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
হাছান স্যারের ব্যক্তিত্বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর পরিপাটি চলাফেরা ও পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ। সব সময় তাঁকে দেখেছি অত্যন্ত গোছানো ও পরিপাটি অবস্থায়। তাঁর ছোট ছোট চুলও থাকত সুন্দরভাবে সাজানো। পকেটে থাকত একটি ছোট্ট চিরুনি। কখনো চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে গেলে চিরুনি দিয়ে সেগুলো ঠিক করে নিতেন। স্যারের পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটির প্রতি এই যত্নশীলতা আমাদের ভীষণ ভালো লাগত।
একজন আদর্শ শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও বাহ্যিক পরিপাটিও যে শিক্ষার্থীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, হাছান স্যার ছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইতিহাসের ক্লাসে হাছান স্যারের পাঠদান ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তিনি যখন ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে অনর্গল লেকচার দিতেন, তখন মনে হতো, আমরা যেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বসে ক্লাস করছি। কখনো মনে হতো, তিনি কোনো সেমিনার কিংবা সিম্পোজিয়ামে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে প্রাঞ্জল বক্তব্য দিচ্ছেন।
তাঁর উপস্থাপনা ছিল সাবলীল, তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ, বিভিন্ন যুগের পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয়গুলো তিনি এমন চমৎকারভাবে তুলে ধরতেন যে পাঠগুলো সহজেই আমাদের বোধগম্য হয়ে উঠত।
স্যারের পাঠদানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, শ্রেণিকক্ষেই আমরা পাঠের মূল বিষয়গুলো আয়ত্ত করে ফেলতে পারতাম। বাড়িতে ফিরে ইতিহাসের বই নিয়ে নতুন করে খুব বেশি সময় ব্যয় করতে হতো না। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা ও গভীর ব্যাখ্যা পাঠগুলোকে আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে দিত।
শুধু পাঠদানেই নয়, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক ও সহজ-সরল স্বভাবের মানুষ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন। তাঁর মুখে প্রায়ই লেগে থাকত মৃদু হাসি, যা তাঁকে আরও আপন করে তুলত। তাঁর আচরণে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা কিংবা অযথা গাম্ভীর্য। বরং তাঁর সহজ-স্বাভাবিক ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মনে সাহস ও স্বস্তি জোগাত।
আমার যতদূর মনে পড়ে, তাঁকে কখনো বেত হাতে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে দেখিনি। শিক্ষার্থীদের শাসন করার চেয়ে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাদের কাছে টেনে নেওয়ার দিকেই যেন তাঁর বেশি মনোযোগ ছিল। তাঁর এই স্নেহপূর্ণ আচরণ তাঁকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছিল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যে ভয়ভীতির নয়, বরং শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক আস্থার—হাছান স্যারের আচরণে তারই প্রতিফলন ঘটত।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো, তা হলো তাঁর শুদ্ধ ও সাবলীল কথনভঙ্গি। তিনি অত্যন্ত মার্জিত ও স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন। তাঁর ভাষা ছিল পরিশীলিত, বক্তব্য ছিল গোছানো এবং কথাবার্তায় ছিল শালীনতার পরিচয়। আঞ্চলিক কথ্যভঙ্গির পরিবর্তে প্রমিত ভাষায় কথা বলার অভ্যাস তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। তাঁর কথাবার্তা থেকেও শিক্ষার্থীরা ভাষার শুদ্ধতা ও মার্জিত প্রকাশভঙ্গির শিক্ষা পেত।
সব মিলিয়ে, জনাব মোহাম্মদ হাছান স্যার ছিলেন জ্ঞানসমৃদ্ধ পাঠদান, পরিপাটি ব্যক্তিত্ব, শুদ্ধ ভাষাচর্চা ও শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণের এক সুন্দর সমন্বয়। তাঁর ক্লাসের প্রাণবন্ত পরিবেশ, ইতিহাসকে সহজ করে বোঝানোর অসাধারণ দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক আমাদের স্মৃতিতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
সাবেক বিভিন্ন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জানা যায়, হাসান স্যার যখন মাদরাসায় নতুন যোগদান করেন, তখন কোনো শ্রেণিকক্ষেই ফ্যান ছিল না। তিনি প্রথমে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সুধী-শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতা নিয়ে প্রায় সব শ্রেণিকক্ষে ফ্যানের ব্যবস্থা করেন।
শিক্ষার্থীদের পোশাক ও অ্যাসেম্বলির ব্যাপারেও স্যারের আগ্রহ ও তদারকি ছিল উল্লেখ করার মতো। তিনি যোগদানের সময় অধিকাংশ শিক্ষার্থী লুঙ্গি পরেই ক্লাসে আসত। স্যার শিক্ষার্থীদের পায়জামা বা প্যান্ট পরে ক্লাসে আসা বাধ্যতামূলক করেন।
বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও শিক্ষাসফরের আয়োজনেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করতেন।
আরও জানা যায়, তিনি অনেক গরিব ও অসহায় শিক্ষার্থীকে গোপনে সহায়ক বইপত্র কিনে দিতেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তানের জনক।
اللَّهُمَّ احْفَظْ أُسْتَاذَنَا مُحَمَّدَ حَسَنٍ، وَبَارِكْ فِي عُمْرِهِ وَصِحَّتِهِ وَعِلْمِهِ، وَاجْعَلْ جُهُودَهُ فِي تَعْلِيمِ الْأَجْيَالِ صَدَقَةً جَارِيَةً لَهُ، وَارْزُقْهُ سَعَادَةَ الدَّارَيْنِ. آمِينَ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ.
বাংলা অর্থ:
হে আল্লাহ! আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মোহাম্মদ হাছান স্যারকে হেফাজত করুন। তাঁর জীবন, সুস্থতা ও জ্ঞানে বরকত দান করুন। প্রজন্মকে শিক্ষিত করার তাঁর প্রচেষ্টাকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন এবং তাঁকে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ দান করুন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দীন / প্রাক্তন শিক্ষার্থী
#kalauzanshahrashidiafazilmadrasah
#lohagara_satkania #kalauzan #Lohagara,#Amirabad #padua #প্রিয়_শিক্ষক #, #MadrasahBoard #Chattogram #MadrasaEducation
৮
৮ মন্তব্য