Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

মেধাবীদের স্কুলে প্রযুক্তির সংকট, পুরোনো কম্পিউটারে চলছে পাঠদান

একটি কম্পিউটার ঘিরে বসেছে কয়েকজন শিক্ষার্থী। কেউ কি-বোর্ডে কাজ করছে, কেউ মনিটরের দিকে তাকিয়ে নিজের পালার অপেক্ষায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী ৫০ থেকে ৬০ জন হলেও প্রত্যেকের জন্য আলাদা কম্পিউটারে অনুশীলনের সুযোগ নেই। ফলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের বদলে অনেক শিক্ষার্থীকেই অন্যের কাজ দেখা কিংবা শিক্ষকের দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

এ চিত্র উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বগুড়া জিলা স্কুলের। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে ভালো ফলাফল ও কৃতী শিক্ষার্থী তৈরির জন্য পরিচিত। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সামনে আসছে। পরীক্ষায় ভালো ফলের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের যে প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তা কতটা পূরণ করা সম্ভব, সেই প্রশ্নই উঠছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি কম্পিউটার ল্যাব ও একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। ল্যাবে মোট ২৭টি কম্পিউটার থাকলেও সচল রয়েছে ১৭ থেকে ১৮টি। যন্ত্রগুলোও বেশ পুরোনো। ফলে শিক্ষার্থীর তুলনায় কম্পিউটারের সংখ্যা কম হওয়ায় ব্যবহারিক ক্লাসে প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত ১১ অক্টোবর বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব ঘুরে দেখা যায়, সচল কম্পিউটারের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। একসঙ্গে সবাইকে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে পুরোনো কম্পিউটার চালু করা এবং কাজের উপযোগী করতে সময় লাগায় সীমিত ক্লাসের মধ্যে ব্যবহারিক পাঠ শেষ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল সাদ রিশাদ জানায়, তাদের শ্রেণিতে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু সচল কম্পিউটার ২০টিরও কম। ফলে একটি কম্পিউটারে একাধিক শিক্ষার্থীকে কাজ করতে হয়। পুরোনো কম্পিউটার চালু করতেও অনেক সময় চলে যায়। এতে প্রত্যেকের নিজের হাতে কাজ করে শেখার সুযোগ কমে আসে।

ল্যাবের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক শাজাহান আলী বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আইসিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদ্যালয়টিতে এ বিষয়ের কোনো অনুমোদিত শিক্ষক পদ নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি ক্লাস পরিচালনা করছেন।

তিনি জানান, বিদ্যালয়ের কম্পিউটারগুলো কেনা হয়েছিল ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেগুলোর সক্ষমতা কমে গেছে। র‌্যাম, স্টোরেজ ও প্রসেসরের সীমাবদ্ধতার কারণে আধুনিক সফটওয়্যার চালানো কঠিন হয়। পর্যাপ্ত কম্পিউটার না থাকায় অনেক সময় শিক্ষার্থীদের নিজেরা কাজ করার সুযোগ না দিয়ে শিক্ষকের দেখানো কাজ পর্যবেক্ষণের মধ্যেই ব্যবহারিক পাঠ সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।

প্রযুক্তি শিক্ষার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানেও সময়ের সংকট রয়েছে বিদ্যালয়টিতে। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এখানে মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৯২৪ জন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদান পরিচালিত হয় দুই শিফটে।

বিদ্যালয়ের সময়সূচি অনুযায়ী, প্রভাতি শিফট শুরু হয় সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে, শেষ হয় দুপুর ১২টায়। এরপর মাত্র ১০ মিনিটের বিরতিতে শুরু হয় দিবা শিফট, যা চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দুই শিফটের পাঠদান ও সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করতে ৪০ মিনিটের ক্লাস কমিয়ে ৩৫ মিনিট করা হয়েছে। টিফিনের জন্য শিক্ষার্থীরা সময় পায় ২০ মিনিট।

শিক্ষকদের ভাষ্য, একটি ক্লাসে উপস্থিতি নেওয়া, পাঠের বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করা, বোর্ডে লেখা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং নির্ধারিত পাঠ শেষ করতে হয় এই স্বল্প সময়ে। বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়ে অনুশীলন কিংবা ব্যবহারিক কাজের প্রয়োজন হলে সময়ের সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ধারণা পরিষ্কার করা এবং পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়।

শুধু কম্পিউটার ল্যাব নয়, বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের জন্য আলাদা ল্যাব থাকলেও সেগুলোর অনেক যন্ত্রপাতি পুরোনো। প্রয়োজনীয় নতুন সরঞ্জামের অভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।

ভৌতবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, বিজ্ঞানাগারে প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই পুরোনো। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞান শিক্ষা দিতে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন বিষয় বুঝতে পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের নিজেরা কাজ করার সুযোগ প্রয়োজন। কিন্তু যন্ত্রপাতি অচল কিংবা পুরোনো হলে ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক শিক্ষায় নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরীক্ষার ফলাফলে বিদ্যালয়টির সাফল্য উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা মিলিয়ে বিদ্যালয়টির ২২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই উত্তীর্ণ হন। বিজ্ঞান বিভাগের ২১৯ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ অর্জন করেন ২১৭ জন। এর আগের বছর ২৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন।

এ ছাড়া জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ৪৭ জন শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুলে এবং সব মিলিয়ে ৮৭ জন বৃত্তি লাভ করে।

ফলাফলে এমন সাফল্য থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি, কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় কম্পিউটার ও বিজ্ঞানাগারের সরঞ্জাম বাড়ানো এবং আইসিটি বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


মন্তব্য করুন

ব্লগ