Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:০৮ অপরাহ্ণ

টাইমস্কেলের নস্টালজিয়া বনাম উন্নিত স্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের বাস্তবতা: কোন পথে প্রাথমিক শিক্ষকের মুক্তি?
টাইমস্কেলের নস্টালজিয়া বনাম উন্নিত স্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের বাস্তবতা: কোন পথে প্রাথমিক শিক্ষকের মুক্তি?
— একটি সমসাময়িক আইনি ও নীতিগত বিশ্লেষণ
বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগের বিষয় হলো পে-ফিক্সেশন, সার্ভিস বহি যাচাই এবং বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে প্রেরিত অডিট আপত্তির পত্রসমূহ। বিশেষ করে ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হাজার হাজার শিক্ষক তাঁদের চাকরির ১০, ১৬ এমনকি ১৮ বছর অতিক্রম করার পরও কাঙ্ক্ষিত উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই চরম বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ে রিট করার প্রবণতা এবং নতুন করে আন্দোলনের ডাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের দাবি এবং আন্দোলনের অভিমুখ কি সঠিক পথে আছে? বিদ্যমান বেতন স্কেল গেজেটের আইনি কাঠামোতে দাঁড়িয়ে আমাদের ঠিক কোন দাবিটি তোলা উচিত? আসুন, আবেগ সরিয়ে বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
১. ৩টি টাইমস্কেল পুনর্বহালের রিট: আইনি ভিত্তি কতটা শক্তিশালী?
২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের মাধ্যমে বিগত শতাব্দীর ‘টাইমস্কেল’ ও ‘সিলেকশন গ্রেড’ প্রথাটি সামগ্রিকভাবে বিলুপ্ত করে সমগ্র সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অভিন্ন ‘উচ্চতর গ্রেড’ (১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে) প্রবর্তন করা হয়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, যখন কোনো একটি পদ্ধতি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন কেবল একটি নির্দিষ্ট বিভাগের জন্য পূর্বের সেই ‘টাইমস্কেল’ হুবহু পুনর্বহালের আবেদন নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা অত্যন্ত দুর্বল গ্রাউন্ড তৈরি করে। বিদ্যমান জাতীয় বেতন স্কেলের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে এমন কোনো রায় পাওয়া সুদূরপরাহত। ফলে অর্থ ও সময় ব্যয় করে এই পথে চূড়ান্ত সাফল্য আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
২. ২০০৬–২০১৮ ব্যাচের বঞ্চনা এবং নেতৃত্বের অগ্রাধিকারের সংকট
আমাদের শিক্ষক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠ শিক্ষকবৃন্দ, যাঁরা ইতোমধ্যেই পুরাতন স্কেলে ২ বা ৩টি টাইমস্কেল ভোগ করে শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন। ফলে ২০১৫-এর উচ্চতর গ্রেড জটিলতায় ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের আর কোনো কিছু হারানোর বা পাওয়ার নেই।
কিন্তু এর মারাত্মক মাশুল দিচ্ছে ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রজন্ম। দীর্ঘ এক থেকে দেড় যুগ শিক্ষকতা করার পরও তাঁরা একটি উচ্চতর গ্রেডও পাচ্ছেন না। এর মূল কারণ—০৯/০৩/২০১৪ তারিখের ‘উন্নীত স্কেল’। হিসাব বিভাগ এই উন্নীত স্কেলকে নতুন আর্থিক সুবিধা বা পদোন্নতি গণ্য করে শিক্ষকদের যোগদানের তারিখের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন করছে এবং ১০/১৬ বছর পূর্তির হিসাব আটকে দিচ্ছে।
৩. নতুন ‘উন্নীত স্কেলের’ ফাঁদ: সমস্যা সমাধানের নামে সংকট দীর্ঘায়িত করা?
নেতৃত্বের একটি অংশ এই উচ্চতর গ্রেডের বঞ্চনা দূর করার বিকল্প হিসেবে আবারও নতুন করে ‘উন্নীত স্কেলের’ দাবি নিয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন। কিন্তু এই ধারণার ভেতরে একটি আত্মঘাতী ফাঁদ লুকিয়ে রয়েছে:
বর্তমান গেজেট কাঠামোতে যদি আবারও নতুন একটি উন্নীত স্কেল ঘোষণা করা হয়, তবে আইনগতভাবে চাকরির সময়কাল গণনা (Counter) আবারও নতুন তারিখ থেকে শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ফলস্বরূপ, একজন ২০ বছরের অভিজ্ঞ শিক্ষক যে গ্রেডে থাকবেন, সদ্য যোগদান করা শিক্ষকও একই গ্রেডে অবস্থান করবেন। অর্থাৎ, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ আরও ৮–১০ বছর পিছিয়ে যাবে।
এ কারণেই সাধারণ শিক্ষকরা এই জাতীয় দাবির সাথে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত করতে পারছেন না। কারণ তাঁরা স্কেলের চেয়ে ‘সার্ভিস বেনিফিট’ বা ক্যারিয়ার অগ্রগতির স্বীকৃতি চান।
৪. বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান কী?
সরকার কখনো জাতীয় বেতন স্কেল গেজেটের মূল নীতিমালার বাইরে গিয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয় না। তাই আমাদের লড়াইটি হতে হবে বিদ্যমান গেজেটের ভেতরে থেকেই যৌক্তিক ব্যাখ্যার আদায় করা।
আমাদের একমাত্র ও প্রধান দাবি হওয়া উচিত:
👉 "০৯/০৩/২০১৪ সালের উন্নীত স্কেল কোনো পদোন্নতি নয়, এটি ছিল স্কেল সমন্বয় বা আপগ্রেডেশন। সুতরাং, উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চাকুরিকাল গণনা কোনোভাবেই ২০১৪ থেকে নয়, বরং যোগদানের মূল তারিখ থেকেই কার্যকর করতে হবে।"
কেন এটিই সবচেয়ে সহজ ও বাস্তবায়নযোগ্য পথ?
১. এটি জাতীয় বেতন স্কেলের মূল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
২. অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিপূর্বে অন্যান্য দপ্তরের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্পষ্টীকরণ (Clarification) প্রদান করেছে।
৩. রিট করতে হলেও এই গ্রাউন্ডে করা যুক্তিযুক্ত—যেখানে বৈষম্যহীনভাবে যোগদানের তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেড চাওয়ার শতভাগ আইনি ভিত্তি রয়েছে।
উপসংহার
অতীতের বাতিল হওয়া ব্যবস্থার পেছনে না ছুটে কিংবা নতুন কোনো স্কেল-জটিলতার ফাঁদে পা না দিয়ে, আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—বিদ্যমান উচ্চতর গ্রেডকে উন্নীত স্কেলের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করা।
শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দের প্রতি বিনীত আহ্বান—আবেগনির্ভর বা নস্টালজিক দাবি পরিহার করে, মাঠপর্যায়ের নবীন ও মধ্যম সারির হাজার হাজার শিক্ষকের অধিকার সুরক্ষায় বাস্তবসম্মত পলিসি ডায়লগে আসুন। সঠিক আইনি যুক্তি ও বিধিমালার আলোকে এগোলেই কেবল শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনার অবসান সম্ভব।
(লেখক: প্রাথমিক শিক্ষার সমসাময়িক বিধি-বিধান ও নীতিমালার একজন সচেতন পর্যবেক্ষক ।
#প্রাথমিক_শিক্ষক #উচ্চতর_গ্রেড_রক্ষা #আইনি_করণীয় #প্রশাসনিক_আপিল #PrimaryTeacherRights #SaveHigherGrade
মন্তব্য করুন

ব্লগ