Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৮ অপরাহ্ণ

জসিম স্যার—যাঁর যতিচিহ্নের পাঠ আজও স্মরণে অমলিন

জসিম স্যার—যাঁর যতিচিহ্নের পাঠ আজও স্মরণে অমলিন


জসিম উদ্দিন স্যার কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার সাবেক বাংলা বিষয়ের প্রভাষক। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর  বাংলা বিভাগে অধ্যয়ন করেছেন।  বাড়ি কলাউজান হরিনা। তাঁর পিতা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্যারও মাদরাসায় কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি নিজতালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।


সম্ভবত আমরা যখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখনই স্যার মাদরাসায় যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও তিনি আমাদের মতো জুনিয়র  স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতেন। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি ও অঙ্কে তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে তিনি নিজেই ক্লাস নিতেন। তাঁর পাঠদান ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহী।


অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের আরবি, বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু—প্রতিটি বিষয়ের হ্যান্ডরাইটিং নিয়মিত লিখতে হতো। ছুটির দিনেও বাড়ির কাজ থাকত; প্রতিটি বিষয়ে অন্তত দশটি করে।

একদিন বাংলা হ্যান্ডরাইটিং খাতায় আমার দাঁড়ি দেওয়ার ধরন স্যারের নজরে পড়ল। আমি দাঁড়ি দিতাম বেশ ছোট করে, অনেকটা কমার মতো—অক্ষরের প্রায় অর্ধেক। স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে বুঝিয়ে দিলেন দাঁড়ি দেওয়ার সঠিক নিয়ম। সেদিন তিনি বলেছিলেন—

“শেষের অক্ষর যত বড় হয়, দাঁড়িও তত বড় হয়।”

কত সাধারণ একটি বাক্য, অথচ আমার হৃদয়ে কী গভীরভাবে গেঁথে আছে! সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু ভুলে গেলেও স্যারের এই ছোট্ট পাঠ আজও বিস্মৃত হইনি। নিজের লেখালেখিতে যেমন তাঁর কথা মনে পড়ে, তেমনি শিক্ষার্থীদের যতিচিহ্ন শেখানোর সময়ও তাঁর সেই উক্তি স্মরণ করি। সেদিনের শ্রেণিকক্ষ থেকে পাওয়া শিক্ষাটি আজও আমার শিক্ষকতা-জীবনে জীবন্ত।

স্যার হয়তো সেদিন শুধু দাঁড়ি দেওয়ার নিয়ম শিখিয়েছিলেন, কিন্তু অজান্তেই আমার হৃদয়ে এঁকে দিয়েছিলেন তাঁর স্মৃতির এক স্থায়ী চিহ্ন।



স্যার ছিলেন অত্যন্ত মিশুক ও আন্তরিক। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতেন, ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন অনেক সময়।  তাঁর স্নেহপূর্ণ আচরণে শিক্ষার্থীরা সহজেই আপন হয়ে উঠত। 


তিনি ছিলেন নিবিড় পাঠাভ্যাসের অধিকারী। মাদরাসার অফিসে অবসর সময়ে তাঁকে প্রায়ই বই পড়তে দেখতাম। বই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। প্রায় সময় দেখতাম হাতে একটা বই।


 বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একজন প্রভাষকের কাছ থেকে জুনিয়র  স্তরেই পাঠ গ্রহণ করা আমাদের জন্য ছিল পরম সৌভাগ্যের।


একদিন বিকেলে আমি ও জনাব বেলাল আশরাফী—বর্তমানে নেভাল একাডেমির একজন কর্মকর্তা—মোটরসাইকেলে ঘুরতে ঘুরতে নিজতালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে গেলাম। রাস্তার পাশ থেকে লক্ষ করলাম, স্যার বিদ্যালয়ের মাঠে একা কাজ করছেন। ভেতরে গিয়ে দেখলাম, মাগরিবের আজানের ঠিক আগমুহূর্তে তিনি নিজ হাতেই মাঠ পরিষ্কার করছেন।

কথা প্রসঙ্গে জানালেন, বিদ্যালয়ে কোনো কর্মচারী নেই; তাই প্রয়োজনীয় কাজগুলো তাঁকেই করতে হয়।  প্রতিদিন সব কাজ শেষ করেই তিনি বাড়ি ফেরেন।

সেদিনের দৃশ্যটি আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। একজন প্রধান শিক্ষক হয়েও নিজ হাতে বিদ্যালয়ের আঙিনা পরিষ্কার করছেন—প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন নিষ্ঠা ও ভালোবাসা সত্যিই বিরল। 


মহান আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা, নেক হায়াত ও অফুরন্ত বরকত দান করুন। আপনার জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার্থীদের জন্য রেখে যাওয়া অবদান কবুল করে উত্তম প্রতিদান দান করুন। 

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।


মু. নাজিম উদ্দীন,  প্রাক্তন শিক্ষার্থী


#Govt_primary_School

#Education #Kalauzan #Lohagara #Chattogram

মন্তব্য করুন

ব্লগ