Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪০ অপরাহ্ণ

মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ (রাহ.)—যিনি ছিলেন অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার অধিকারী


মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ (রাহ.)—যিনি ছিলেন অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার অধিকারী


মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ (রাহ.)—সবার কাছে যিনি ‘কামেল সাহেব’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ, একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী, পণ্ডিত, বিনয়ী ও নিরহংকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।


তিনি ছিলেন পূর্ব কলাউজানের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা তৈয়ব উল্লাহ মাস্টার নামে এলাকায় সুপরিচিত ছিলেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও কামেল সাহেবের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও অনাড়ম্বর। তাঁর মধ্যে ছিল না কোনো অহংকার কিংবা আভিজাত্যের বড়াই।


দীর্ঘ শিক্ষকতাজীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ৫ জুলাই তিনি ইহলোক ত্যাগ করে পরকালের পথে পাড়ি জমান। তাঁকে পারিবারিক বাড়ির পাশের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।


২০০০ সালে আমি কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল মাদরাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। তবে তার আগে থেকেই হুজুরের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। কানুরাম বাজারে ডা. আবু তাহের সাহেবের দোকানে তিনি বসতেন। ডা. সাহেব দৈনিক কর্ণফুলী পত্রিকা রাখতেন। আমিও বিকেলবেলা পত্রিকা পড়তে সেখানে যেতাম। তখন হুজুরের সঙ্গে দেখা হতো, তিনি আমার কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর প্রথম স্থান অধিকার করলে আমার প্রতি তাঁর স্নেহ আরও বেড়ে যায়।


তিনি ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষার্থীবান্ধব। সবাইকে সমান চোখে দেখতেন, স্নেহ করতেন। দেখা হলেই মমতা মিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করতেন, ‘ভালো আছস না?’ একজন উপাধ্যক্ষ হয়েও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর ছিল অকৃত্রিম সখ্য। পদমর্যাদার কোনো অহংকার ছিল না; বরং শিক্ষার্থীদের আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।


তাঁর জীবনযাপনও ছিল অনুকরণীয়। একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং ফাজিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ হয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে। প্রতিদিন সাইকেলে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাদরাসায় যেতেন। আমরা অবাক হয়ে তাঁর সেই সাধারণ জীবনযাপন দেখতাম।


আমার আট বছরের শিক্ষাজীবনে তাঁর যে গুণটি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো তাঁর অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা। প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি ছিলেন অনন্য। শিক্ষার্থীরা মাঠে-ঘাটে হৈচৈ করলে হাতে বেত নিয়ে অফিস থেকে বের হলেই পরিবেশ শান্ত হয়ে যেত। চারদিকে নেমে আসত পিনপতন নীরবতা। টিফিনের সময় কোনো শিক্ষার্থী পালিয়ে বাড়ি চলে গেলেও তিনি কঠোর অবস্থান নিতেন। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। একদিন দুপুরে এলাকার বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। পরদিন হুজুরের কঠোর শাসনের মুখোমুখি হই। সেই ঘটনার পর আর কখনো এভাবে পালিয়ে বাড়ি যাইনি। আজ বুঝি, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবোধ ও দায়িত্বশীলতা গড়ে তুলতেই তাঁর এই কঠোরতা ছিল।


কামেল সাহেব ছিলেন একজন চমৎকার শিক্ষকও। তাঁর সুমধুর কণ্ঠে পাঠদানের সুর ছিল অনন্য। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সুর আজও স্মৃতিতে বাজে।


শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ওয়ায়েজ। লোহাগাড়ার বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তিনি সাবলীলভাবে ওয়াজ-নসিহত করতেন।

 জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, পাঠদানের দক্ষতা ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ে তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।


اللَّهُمَّ اجْزِ أُسْتَاذَنَا عَنَّا خَيْرَ الْجَزَاءِ، وَبَارِكْ فِي عِلْمِهِ الَّذِي عَلَّمَنَا، وَاجْعَلْ مَا غَرَسَهُ فِي قُلُوبِنَا مِنَ الْعِلْمِ وَالْخَيْرِ نُورًا لَهُ فِي قَبْرِهِ، وَرِفْعَةً لِدَرَجَاتِهِ فِي الْجَنَّةِ.


অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের উস্তাদকে উত্তম প্রতিদান দিন। তিনি আমাদের যে ইলম শিখিয়েছেন, তাতে বরকত দিন। আমাদের হৃদয়ে তিনি যে জ্ঞান ও কল্যাণের বীজ বপন করেছেন, তা তাঁর কবরের নূর এবং জান্নাতে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ বানিয়ে দিন।


سَقَى اللَّهُ ثَرَاهُ، وَجَعَلَ الْجَنَّةَ مَثْوَاهُ

অর্থ: আল্লাহ তাঁর কবরের মাটিকে সিক্ত করুন এবং জান্নাতকে তাঁর আবাসস্থল বানিয়ে দিন। 

آمِينَ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ

লেখক: নাজিম উদ্দীন প্রাক্তন শিক্ষার্থী


#kalauzanshahrashidiafazilmadrasah 

#kalauzan #Lohagara #Chattogram #MadrasaEducation #প্রিয়_শিক্ষক #স্মরণ #MadrasahBoard

মন্তব্য করুন

ব্লগ