প্রভাষক
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৪২ অপরাহ্ণ
নব্য সভ্যতার ভোগ-প্রবণতা পরিবেশের জন্য হুমকি
শুধুমাত্র প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিকতাকে পরিবেশ বোঝায় না। কোনো ব্যবস্থার ওপর কার্যকর বাহ্যিক অনুঘটক কিংবা প্রভাবকসমূহের সমষ্টিগত মানবিক ও অ-মানবিক প্রতিক্রিয়াও পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিনাশ সাধন, অপরদিকে মানবসৃষ্ট পরিবেশের ক্রমবৃদ্ধি। লভ্যাংশ প্রসারের তাগাদায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, বৃক্ষ ও বনভূমি উজার, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, নদনদী ভরাট, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি ধ্বসসহ সকল মানবসৃষ্ট চাহিদা ও লোভাতুর চিন্তাধারার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতির কারণে উত্তর মেরুর বরফ গলে সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা এবং নদী ভাঙনের মতো অভিশপ্ত বিপর্যয়।
প্রতি বছর দেশে লক্ষাধিক মানুষ বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সহস্রাধিক মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয় পানির স্রোতে। বিগত এক শতাব্দীতে সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ১৫ সে.মি.। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে বন্যার পানিতে সেসব মিশে পতিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রে; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীবনচক্র। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা জানায়, বিশ্বে যে হারে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে তাতে করে এই শতাব্দীর শেষপ্রান্তে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মানুষের এই নির্মম চপেটাঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ ও পরিবেশ-বিজ্ঞানীদের মাঝে যে উদ্বিগ্নতা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তা নিয়ে যুগ যুগ বছর আগে সাহিত্যিক, আলোচক এবং গণ্যমান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গেরা সন্দিহান ছিলেন। এছাড়া জীবনান্দদাশ, বিভূতিভূষণ, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের রচনায় প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি গভীর টান পরিলক্ষিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর “সভ্যতার প্রতি” কবিতায় উদাত্তভাবে শহুরে জীবন বর্জনের আহ্বান জানান। বিভূতিভূষণ আরণ্যক রচনা করে প্রকৃতির প্রতি তাঁর মায়া ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবনানন্দ হিজল বনের বর্ণনা দিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা। মার্কিন সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন বলেছেন, “পরিবেশ মানুষকে যা শিক্ষা দেয়, পাঠ্যপুস্তক তা দিতে পারে না”।
তাই রবী-ঠাকুরের ভাষায় বলতেই হয়,
“দাও ফিরে দাও সে অরণ্য, লও এ নগর।
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর।”
শুধুমাত্র আইন প্রণয়নে যন্ত্রসভ্যতার গোড়াপত্তন কিংবা প্রকৃতির বিকাশ ও গণসচেতনতার উত্থান সম্ভব নয়। আইনের প্রয়োগ এবং পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে সকলের মনে একটি দৃশ্যপট তৈরি একান্ত জরুরি। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে মোট বনভূমি ১৭.৫ শতাংশ; যেখানে একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। এই বিপর্যয় হতে পরিত্রাণের লক্ষ্যে আমাদের ড. সালিমুল হকের দেখানো পথে হাঁটাই শ্রেয়।
দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে রাস্তা কিংবা জলাশয়ের কিনারা, গৃহস্থালি ও পতিত জমি সর্বত্র কৃত্রিম বনাঞ্চল সৃষ্টি যুগোপযোগী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হবে। জ্বালানি হিসেবে কয়লার বিকল্প নবায়নযোগ্য পানি, বায়ু কিংবা সৌর শক্তি ব্যবহারের প্রচলন প্রয়োজন। দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সততা দেশের বনভূমিকে রক্ষা করতে সহায়ক। নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার, প্লাস্টিক বর্জন, পাটজাত পণ্য গ্রহণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানায় ইটিপি, এটিপি এবং জিএলডি বাধ্যতাকরণ বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় একান্ত প্রয়োজন।
কৃষির মতো অত্যাবশ্যকীয় কাজটিও যে আমাদের পরিবেশের ব্যাপক
ক্ষতি সাধন করছে প্রতিনিয়ত তা এই যুগে এসে বুঝতে পারাও এক ধরনের সচেতনতা। আগে যা
ছিল প্রকৃতির দান তা যেন আজ আমরা জোর করে আদায় করে নেওয়ার পায়তারা করছি; অবশ্য
আমাদের জন-বৃদ্ধি এর জন্য প্রধান প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করছি। পুঁজিবাদ ও
ভোগবাদের কপাট থেকে সরে না দাঁড়াতে পারাটা সারাবিশ্বের মানুষের জন্য এক ধরনের
ব্যাধিময় প্রতিবন্ধকতা।
----------
মোঃ হাবিবুর
রহমান
প্রভাষক (কৃষি শিক্ষা)
দিঘাপতিয়া এম.কে. কলেজ, নাটোর।
ফোনঃ ০১৭২৩৪৬০৬৭০
ইমেইল- [email protected]
২
৪ মন্তব্য