সহকারী শিক্ষক
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ
জিগস পদ্ধতি (Jigsaw Method): একটি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও সহযোগিতামূলক শিখন কৌশল।
জিগস পদ্ধতি
জিগস পদ্ধতি হলো এমন একটি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও সহযোগিতামূলক শিখন কৌশল, যেখানে একটি পাঠ্যবিষয়কে কয়েকটি অংশে ভাগ করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দলে কাজ করতে দেওয়া হয়। প্রতিটি দলের সদস্য নির্দিষ্ট একটি অংশ ভালোভাবে শিখে পরে নিজ দলের অন্য সদস্যদের তা শেখায়। এভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থী পুরো পাঠ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
জিগস পদ্ধতির উদ্দেশ্য
জিগস পদ্ধতির প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো—
1. শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে শিখন কার্যক্রমে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।
2. দলগত কাজ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলা।
3. শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করা।
4. যোগাযোগ, উপস্থাপন ও আলোচনা করার দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
5. নিজের ভাষায় বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা তৈরি করা।
6. শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
7. শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতা সৃষ্টি করা।
জিগস পদ্ধতির প্রধান উপাদান
ক. মূল দল (Home Group): শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কয়েকটি ছোট দলে ভাগ করেন। প্রতিটি দলের সদস্যরা পাঠের বিভিন্ন অংশ নিয়ে কাজ করে।
খ. বিশেষজ্ঞ দল (Expert Group): মূল দলের যেসব শিক্ষার্থী একই বিষয় বা অংশ নিয়ে কাজ করে, তারা একত্র হয়ে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে।
গ. সহপাঠীকে শেখানো (Peer Teaching): বিশেষজ্ঞ দল থেকে মূল দলে ফিরে এসে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার শেখা অংশ অন্য সদস্যদের বুঝিয়ে দেয়। এভাবে সবাই মিলে সম্পূর্ণ পাঠটি আয়ত্ত করে।
জিগস পদ্ধতি প্রয়োগের ধাপ
প্রথম ধাপ: পাঠ নির্বাচন ও পরিকল্পনা। শিক্ষক এমন একটি পাঠ নির্বাচন করবেন, যেটিকে কয়েকটি সম্পর্কযুক্ত অংশে ভাগ করা যায়।
দ্বিতীয় ধাপ: শিক্ষার্থীদের মূল দলে ভাগ করা। শিক্ষার্থীদের সাধারণত ৪–৬ জনের ছোট দলে ভাগ করা হয়। দলের সদস্যদের সক্ষমতা ও বৈচিত্র্য বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
তৃতীয় ধাপ: পাঠের অংশ বণ্টন। নির্বাচিত পাঠকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চতুর্থ ধাপ: বিশেষজ্ঞ দল গঠন। একই অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা একত্র হয়ে আলোচনা করে। তারা পাঠ্যবই, শিক্ষকের নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সাহায্যে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝে।
পঞ্চম ধাপ: মূল দলে প্রত্যাবর্তন। বিশেষজ্ঞ দলের আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ মূল দলে ফিরে আসে।
ষষ্ঠ ধাপ: সহপাঠীদের শেখানো। প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নির্ধারিত অংশ সহজ ভাষায় অন্যদের বুঝিয়ে দেয়। দলের অন্য সদস্যরা প্রশ্ন করে এবং প্রয়োজনে ব্যাখ্যা চায়।
সপ্তম ধাপ: মূল্যায়ন ও প্রতিফলন। শিক্ষক প্রশ্নোত্তর, সংক্ষিপ্ত লিখিত পরীক্ষা, দলীয় উপস্থাপনা বা ব্যক্তিগত কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিখন যাচাই করেন।
জিগস পদ্ধতির সুবিধা
1. সক্রিয় অংশগ্রহণ: প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে পাঠে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে।
2. সহযোগিতামূলক মনোভাব: শিক্ষার্থীরা একে অন্যের কাছ থেকে শিখতে পারে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা করতে শেখে।
3. নেতৃত্বের বিকাশ: নিজের শেখা বিষয় অন্যদের বোঝানোর মাধ্যমে নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
4. যোগাযোগ দক্ষতা: আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও উপস্থাপনার মাধ্যমে ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
5. গভীর শিখন: কোনো বিষয় নিজে বুঝে অন্যকে শেখানোর ফলে বিষয়টি অধিকতর স্পষ্ট হয়।
6. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: সহপাঠীদের সামনে বক্তব্য উপস্থাপন করার অভ্যাস তৈরি হয়।
7. সময়সাশ্রয়: বড় পাঠকে ভাগ করে একযোগে কাজ করার মাধ্যমে পাঠের বিভিন্ন অংশ শেখা সহজ হয়।
8. সামাজিক দক্ষতা: ভিন্ন মতামত গ্রহণ, অন্যের কথা শোনা এবং দলীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অভ্যাস গড়ে ওঠে।
জিগস পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকা
জিগস পদ্ধতিতে শিক্ষক মূলত একজন সহায়ক, নির্দেশক ও মূল্যায়নকারীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি পাঠ নির্বাচন, শিক্ষার্থীদের দল গঠন, কাজ বণ্টন, সময় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেন। দলীয় কার্যক্রম চলাকালে তিনি শিক্ষার্থীদের আলোচনা পর্যবেক্ষণ করেন, সমস্যার সমাধানে সহায়তা করেন এবং প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। সবশেষে তিনি শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান মূল্যায়ন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া প্রদান করেন।
মূল্যায়ন পদ্ধতি
জিগস পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের জন্য নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—
1. নির্ধারিত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান ও ধারণা।
2. বিশেষজ্ঞ দলের আলোচনায় অংশগ্রহণ।
3. সহপাঠীদের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার দক্ষতা।
4. প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ও অন্যের প্রশ্নের সমাধান করা।
5. দলীয় সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতা।
6. ব্যক্তিগতভাবে অর্জিত শিখনফল।
জিগস পদ্ধতি একটি কার্যকর সহযোগিতামূলক শিখন কৌশল, যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি যোগাযোগ, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী শুধু জ্ঞান গ্রহণ করে না, বরং জ্ঞান অর্জন করে তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। যথাযথ পরিকল্পনা, উপযুক্ত দল গঠন, শিক্ষকের সক্রিয় সহযোগিতা এবং কার্যকর মূল্যায়নের মাধ্যমে জিগস পদ্ধতিকে শ্রেণিকক্ষে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়
০
০ মন্তব্য