সহকারী শিক্ষক
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ: কেন একসাথে হয়, লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দুটি সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেকের ক্ষেত্রে রোগ দুটি একসঙ্গে দেখা যায়। দুটি রোগ একসঙ্গে থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ এবং চোখের জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
তবে নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এসব জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS) ২০১৭–১৮-এর তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক একটি গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ১০.০৪%, উচ্চ রক্তচাপের হার ২৫.৭০% এবং উভয় রোগের হার ৪.৪৭% পাওয়া গেছে।
বিষয় | প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হার |
ডায়াবেটিস | ১০.০৪% |
উচ্চ রক্তচাপ | ২৫.৭০% |
উভয় রোগ | ৪.৪৭% |
সিলেট অঞ্চলের একটি গবেষণায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার ৬১.৪% পাওয়া গেছে। তবে গবেষণার এলাকা, সময়, অংশগ্রহণকারী ও পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে এসব পরিসংখ্যান সরাসরি তুলনা করা উচিত নয়।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের পেছনে বেশ কিছু সাধারণ ঝুঁকি রয়েছে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, অতিরিক্ত ওজন, কিডনির কার্যকারিতার পরিবর্তন এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই দুই রোগের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দেয় না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপেরও সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালী ও কিডনির ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালী ও অন্যান্য অঙ্গের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
কিডনি শরীরের লবণ ও পানির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। এভাবে ডায়াবেটিস, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপ পরস্পরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অতিরিক্ত লবণ খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া বয়স বৃদ্ধি এবং পরিবারে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
ডায়াবেটিসের কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, তবে উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। তাই শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি।
ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো হলো:
অতিরিক্ত পিপাসা পাওয়া
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া
ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
চোখে ঝাপসা দেখা
হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অসাড় অনুভূতি
এসব লক্ষণ থাকলে রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করানো উচিত। তবে উপসর্গ না থাকলেও ডায়াবেটিস থাকতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়ই নীরব রোগ বলা হয়, কারণ অনেকের ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
কখনো মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে, কিন্তু এগুলো দিয়ে উচ্চ রক্তচাপ নিশ্চিত করা যায় না। রক্তচাপ মেপেই এটি শনাক্ত করতে হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১২০/৮০ mmHg-এর নিচের রক্তচাপ সাধারণত স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে পড়ে। তবে রক্তচাপের শ্রেণিবিভাগ গাইডলাইন অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
চেম্বারে বারবার ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি রক্তচাপ পাওয়া গেলে অনেক গাইডলাইন অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডায়াবেটিস থাকলে রক্তচাপের চিকিৎসার লক্ষ্য ব্যক্তির বয়স, কিডনির অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের প্রচলিত মানদণ্ড হলো:
খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজ ৭.০ mmol/L বা তার বেশি।
৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ গ্রহণের দুই ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজ ১১.১ mmol/L বা তার বেশি।
HbA1c ৬.৫% বা তার বেশি।
সাধারণত স্পষ্ট উপসর্গ না থাকলে পরীক্ষার ফল পুনরায় যাচাই করে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা হয়।
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত করার জন্য বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।
রক্তচাপ: ১৮ বছর বয়স থেকে নিয়মিত মাপা উচিত। ফলাফল ও ঝুঁকি অনুযায়ী পরবর্তী পরীক্ষার ব্যবধান নির্ধারণ করা যায়।
ডায়াবেটিস: সাধারণ ঝুঁকির প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৫ বছর বয়স থেকে স্ক্রিনিং বিবেচনা করা যায়। অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকলে আরও আগে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
আগে পরীক্ষা করানো দরকার হতে পারে: অতিরিক্ত ওজন, পেটের মেদ, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস অথবা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে।
পরীক্ষার সময় ও ব্যবধান চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রযোজ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারণ করুন।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে ওষুধ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক লবণ গ্রহণ ৫ গ্রামের কম রাখা উচিত। পাতে বাড়তি লবণ, অতিরিক্ত নোনতা খাবার, আচার এবং প্যাকেটজাত খাবার সীমিত করুন।
খাবারে শাকসবজি, ডাল, পরিমিত ফল এবং আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। ভাত বা রুটির পরিমাণ ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করুন এবং অতিরিক্ত মিষ্টি ও ভাজাপোড়া কমান।
ওজন বেশি হলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো রক্তে গ্লুকোজ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ, যেমন দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করুন। শারীরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য রোগ অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন নির্ধারণ করুন।
ধূমপান রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান ত্যাগ করুন এবং নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুম, খাদ্যাভ্যাস ও রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত বিশ্রাম, হাঁটা এবং শিথিলায়নের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ করুন। ভালো বোধ করলেও নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না বা ডোজ পরিবর্তন করবেন না।
সঠিক মাপের কাফযুক্ত যাচাইকৃত ডিজিটাল রক্তচাপ মাপার যন্ত্র ব্যবহার করুন। মাপার আগে পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিন এবং পিঠ ঠেস দিয়ে বসে, পা মেঝেতে রেখে, হাত হৃদ্যন্ত্রের সমতলে রাখুন।
রিডিং, তারিখ ও সময় লিখে রাখুন। একাধিক রিডিংয়ের ভিত্তিতে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনির কার্যকারিতা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন, চোখ এবং পায়ের পরীক্ষা করান।
নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন:
উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা দৃষ্টির আকস্মিক পরিবর্তন।
রক্তে গ্লুকোজ কমে কাঁপুনি, ঘাম, বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হওয়ার লক্ষণ।
রক্তে গ্লুকোজ খুব বেড়ে বমি, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, শ্বাসকষ্ট বা পানিশূন্যতার লক্ষণ।
পায়ে এমন ক্ষত, যা সারছে না বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
রক্তচাপ ১৮০/১২০ mmHg বা তার বেশি হলে অন্তত এক মিনিট পর আবার মাপুন। একই রকম থাকলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এর সঙ্গে জরুরি উপএরসর্গ থাকলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন।
না। তবে ডায়াবেটিস থাকলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপের লক্ষ্য ব্যক্তির বয়স, হৃদ্রোগের ঝুঁকি, কিডনির অবস্থা ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ১৩০/৮০ mmHg-এর নিচে রাখার লক্ষ্য বিবেচনা করা হয়, তবে এটি সবার জন্য একই নয়।
অনেকের দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ প্রয়োজন হয়। তবে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। ওষুধ বন্ধ বা কমানোর সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শে নিতে হবে।
সঠিক পদ্ধতিতে একাধিকবার রক্তচাপ মাপুন এবং রিডিং লিখে রাখুন। সম্ভব হলে নিজের যন্ত্রটি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে মাপার পদ্ধতি ও যন্ত্রের নির্ভুলতা যাচাই করান।
হ্যাঁ। নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক কার্যকলাপ, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে রোগ দুটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দুটি রোগ একসঙ্গে থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি ও চোখের জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই উপসর্গের অপেক্ষা না করে নিয়মিত পরীক্ষা করান, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যান।
৮
৮ মন্তব্য