সহকারী শিক্ষক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মাওলানা গোলাম রছুল কমরী—যাঁর প্রতিটি ক্লাস ছিল একেকটি ওয়াজ মাহফিল!
আলহাজ্ব জনাব মাওলানা গোলাম রছুল কমরী। আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় উস্তাদ। কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার প্রাক্তন শিক্ষক। সম্ভবত মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকদের একজন ছিলেন তিনি। আমাদের সময়ে তাঁকে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবেও পেয়েছি। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর শিক্ষকতা-জীবনের স্মৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
শিক্ষক পরিচয়ের বাইরেও তাঁর আরেকটি স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে—তিনি কলাউজানের পীর সাহেব। স্থানীয় মানুষের কাছে ‘পীরে সাহেব’ নামেই তিনি সুপরিচিত।
আমাদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সুরের জাদুকর, পাঠদানের এক অনন্য শিল্পী, স্মৃতির পাতায় চিরজাগরূক এক প্রিয় উস্তাদ।
২০০০ সালে আমরা যখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন হুজুর আমাদের ‘মিয়াতে আমেল’ পড়াতেন। একশটি আমেল তিনি ছন্দে ছন্দে, সুরে সুরে এমনভাবে মুখস্থ করিয়েছিলেন যে, প্রায় ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পাঠগুলোর অনেক কিছুই আজও অবিকল স্মৃতিতে জেগে আছে। সেই সুর, সেই ছন্দ, সেই দরাজ কণ্ঠ—নীরব-নিভৃত মুহূর্তে আজও যেন অবচেতন মন থেকে বেরিয়ে আসে।
আহা! কী অপূর্ব ছিল হুজুরের পাঠদানের আসর! কী মায়াবী ছিল তাঁর পড়ানোর ভঙ্গি!
পুরো শ্রেণিকক্ষজুড়ে বিরাজ করত পিনপতন নীরবতা। নেই কোনো অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া, নেই কোনো কথাবার্তা। সবার চোখ নিবদ্ধ হুজুরের মুখে, সবার মনোযোগ তাঁর কণ্ঠে। হুজুর যখন সুমধুর সুরে একের পর এক আমেল পড়তেন, আমরা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তাঁর সঙ্গে সুর মেলাতাম। শ্রেণিকক্ষ যেন পরিণত হতো এক সম্মিলিত সুরের আসরে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ছন্দ আমাদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতো।
সেই সুরের কী যে আকর্ষণ ছিল! ক্লাস শেষ হয়ে যেত, কিন্তু সুরের রেশ শেষ হতো না। হাঁটতে, বসতে, চলতে—সবখানেই সেই সুর আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকত। বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকত না পাঠ; তা ছড়িয়ে পড়ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, মিশে যেত স্মৃতির গভীরে।
যাঁরা সেই সময় হুজুরের পাঠদানের সাক্ষী ছিলেন, তাঁরাই কেবল অনুভব করতে পারবেন সেই অনির্বচনীয় মুগ্ধতার গভীরতা। হুজুরের ক্লাস মানেই যেন একেকটি ওয়াজ মাহফিল! তাঁর পাঠদানে ছিল ওয়াজের সুর, দরাজ কণ্ঠের গাম্ভীর্য, উচ্চারণের মাধুর্য আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি শুধু পড়াতেন না, পাঠকে জীবন্ত করে তুলতেন। তাঁর কণ্ঠের মায়ায় পাঠগুলো এমনভাবে হৃদয়ে গেঁথে যেত যে, বাড়ি ফিরে আবার বই খুলে পড়ার প্রয়োজনও অনেক সময় অনুভব করতাম না।
অষ্টম শ্রেণিতে হুজুর আমাদের কুরআন পড়াতেন। তখন তাঁর পাঠদানের আরেক অনন্য রূপ প্রত্যক্ষ করেছি। কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যখন তিনি সুললিত কণ্ঠে তাফসির করতেন, মনে হতো—আমরা যেন কোনো ওয়াজ মাহফিলে বসে আছি। তাঁর কণ্ঠের দরাজ আওয়াজ, সুরের ওঠানামা, কথার গভীরতা আর উপস্থাপনার মাধুর্য আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত।
সূরা বুরুজের তাফসিরের কথা আজও মনে পড়ে। ইউসুফ (আ.) ও জুলেখার ঘটনা অবলম্বনে তাকওয়া ও আত্মসংযমের যে শিক্ষা তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন। ইসলামের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে কারবালার মর্মস্পর্শী ঘটনাবলি যেভাবে বর্ণনা করতেন, তা শুধু ইতিহাসের পাঠ হয়ে থাকেনি; আমাদের অনুভূতি ও উপলব্ধির অংশ হয়ে গিয়েছিল।
তিনি প্রতিটি পাঠ যুক্তি দিয়ে এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই তা হৃদয়ে ধারণ করতে পারত। অসাধারণ যুক্তিবোধ ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি। জটিল বিষয়ও তাঁর সাবলীল ব্যাখ্যায় সহজবোধ্য হয়ে উঠত।
কী অসাধারণ ছিল তাঁর পাঠদান! কী অনন্য ছিল তাঁর উপস্থাপনা! তাঁর প্রতিটি ক্লাসে ছিল জ্ঞান, আবেগ, দরদি উচ্চারণ ও শিক্ষার্থীদের মন জয় করার এক বিরল সম্মিলন।
আজ হুজুর শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। বয়সের ভারে শরীরও আগের মতো সঙ্গ দেয় না। সময়ের প্রবাহে জীবনের কত অধ্যায় পেছনে পড়ে গেছে! কত শিক্ষার্থী জীবনের নানা পথে ছড়িয়ে পড়েছে! কিন্তু আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় সেই প্রিয় উস্তাদ আজও আগের মতোই উজ্জ্বল। স্মৃতির দরজা খুললেই ভেসে ওঠে তাঁর নূরানী চেহারা, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই চিরচেনা শ্রেণিকক্ষ, কানে বাজে তাঁর দরাজ কণ্ঠে সুরেলা পাঠদানের ধ্বনি।
ভাবতে অবাক লাগে—প্রায় ২৬ বছর আগের শেখানো পাঠ আজও কীভাবে এত জীবন্ত হয়ে আছে! এ যেন কেবল স্মৃতিশক্তির বিস্ময় নয়; এ হলো একজন শিক্ষকের পাঠদানের অসাধারণ দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীর হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার বিরল ক্ষমতার স্বাক্ষর।
মহান আল্লাহ আমাদের শ্রদ্ধেয় উস্তাদকে সুস্থতা, প্রশান্তি ও নেক হায়াত দান করুন। তাঁর শিক্ষকতা-জীবনের প্রতিটি খেদমত কবুল করুন, তাঁর ইলম ও আমলে বরকত দান করুন এবং তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
#স্মরণ #প্রিয়_শিক্ষক
#lohagara_satkania #Lohagara #kalauzanshahrashidiafazilmadrasah #MadrasahBoard #kalauzan #Chattogram
৮
৮ মন্তব্য