সহকারী শিক্ষক
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
পৃথিবীর ১ সেকেন্ড কি মঙ্গলেও ১ সেকেন্ড?
পৃথিবীর ১ সেকেন্ড কি মঙ্গলেও ১ সেকেন্ড? ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ডের সময় প্রসারণের রহস্য !
সময় কি মহাবিশ্বের সব জায়গায় একইভাবে বয়ে চলে? আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা থিউরি আমাদের জানায় যে, সময়ের গতি মোটেও ধ্রুবক নয় অর্থাৎ স্থির নয়। মহাজাগতিক বস্তুর ভর এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ওপর নির্ভর করে সময়ের এই বয়ে চলার গতি একেক জায়গায় একেক রকম হয়। ইদানীং আমরা মঙ্গল গ্রহে আমাদের দ্বিতীয় আবাস গড়ার প্রকল্প হাতে নিয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহে সময় কি একই গতিতে বয়ে চলে?
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে - এই দুই গ্রহে সময়ের গতিতে সামান্য তারতম্য রয়েছে। পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহের মধ্যে সময়ের এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো, গ্র্যাভিটেশনাল টাইম ডাইলেশন (Gravitational Time Dilation) বা মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ। সহজভাবে বলতে গেলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেখানে যত বেশি, সময় সেখানে তত ধীরগতিতে চলে। পৃথিবীর ভর মঙ্গল গ্রহের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও অনেক বেশি শক্তিশালী। এই প্রবল আকর্ষণের কারণে পৃথিবীতে সময়ের ঘড়ি কিছুটা ধীর হয়ে যায়। অন্যদিকে মঙ্গল গ্রহের ভর এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম হওয়ায় সেখানে সময়ের ওপর মহাকর্ষের প্রভাব দুর্বল থাকে। ফলে মঙ্গলের ঘড়ির কাঁটা পৃথিবীর তুলনায় সামান্য দ্রুত ঘোরে।
সম্প্রতি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (National Institute of Standards and Technology - NIST) এর গবেষক নীল অ্যাশবি এবং বিজুনাথ পালটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম গণনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, মঙ্গলের পৃষ্ঠে থাকা একটি ঘড়ি পৃথিবীর তুলনায় প্রতিদিন গড়ে ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে। এই পার্থক্যটি শুনতে খুব সামান্য মনে হলেও আন্তঃগ্রহ নেভিগেশন (Interplanetary Navigation) এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এটি বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। তবে এই সময়ের ব্যবধান সবসময় স্থির থাকে না কারণ মঙ্গল গ্রহ একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। যখন মঙ্গল সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন সূর্যের বিশাল মহাকর্ষীয় টানে মঙ্গলের সময় কিছুটা ধীর হয় আবার সূর্য থেকে দূরে সরে গেলে তা কিছুটা দ্রুত হতে থাকে। এই কারণে পুরো মঙ্গলীয় বছরে প্রতি দিনে এই ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ডের ব্যবধানটি প্রায় ২২৬.৮ মাইক্রোসেকেন্ড পর্যন্ত হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যখন মানুষ মঙ্গলে নিয়মিত যাতায়াত করবে এবং সেখানে রোবট বা ড্রোন ফ্লিট (Rover Fleets) পরিচালনা করবে, তখন এই মাইক্রোসেকেন্ডের হিসাব রাখা জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ পার্থক্যের কারণে একটি মহাকাশযান তার নির্দিষ্ট ল্যান্ডিং স্পট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আছড়ে পড়তে পারে। এই গবেষণাটি মূলত একটি আন্তঃগ্রহ সময় সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, যা ছাড়া মানবজাতির মাল্টি-প্ল্যানেটারি বা বহু গ্রহে ভ্রমণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তথ্যসূত্র (গবেষণাপত্র):
Researchers: Neil Ashby and B. Patla
Title: "A Comparative Study of Time on Mars with Lunar and Terrestrial Clocks",
Journal: The Astronomical Journal (2026).
DOI: 10.3847/1538-3881/ae0c16
৮
৮ মন্তব্য