সিনিয়র শিক্ষক
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১৯ অপরাহ্ণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে চেহারা ভাড়া দেওয়া কতটা বৈধ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন মানুষের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে বাস্তবসম্মত অবতার, বিজ্ঞাপন, ভিডিও ও বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। তাই এরই মধ্যে এআইয়ের কাছে নিজের চেহারা ভাড়া দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়ে গেছে চীনে। কারণ চীনের এআই কম্পানিগুলো তাদের জেনারেট করা ভিডিও আরো বাস্তবসম্মত করতে অর্থের বিনিময়ে মানুষের চেহারার অবয়ব ব্যবহার অধিকার কিনে বা ভাড়া নিচ্ছে।
(সূত্র : গলফ নিউজ : https://shorturl.at/NIyHH)
বিশ্বায়নের এই যুগে এই প্রবণতা দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে মুসলিম সমাজের জন্য নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, তা হলো—কেউ নিজের চেহারা কোনো এআই কম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া বা বাণিজ্যিকভাবে লাইসেন্স দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার বিধান কী হবে? বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম ও জটিল। কারণ এই মাসআলা শুধু ছবি তোলার হুকুমে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে পর্দা, ফিতনা, গোপনীয়তা, প্রতারণা, হারাম কাজে সহযোগিতা এবং উপার্জনের বৈধতার প্রশ্নও যুক্ত রয়েছে। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করা হলো—
ছবির মৌলিক বিধান : জীবন্ত প্রাণীর ছবি তৈরির ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কতা এসেছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ছবি নির্মাতাদের।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫০)
আরেক হাদিসে এসেছে, ছবি নির্মাতাদের বলা হবে, ‘যারা এ জাতীয় (প্রাণীর) ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে : তোমরা যা বানিয়েছিলে তাতে জীবন দাও। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫১) প্রিন্ট করে ফেললে তা নাজায়েজের বিধানের আওতায় চলে যাবে। তবে একান্ত প্রয়োজনে ছবি তোলা জায়েজ হওয়ার ক্ষেত্রে সবাই একমত। যেমন—জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ইত্যাদিতে ছবি বাধ্যতামূলক হওয়ায় এ ধরনের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে। ছবির বিধানের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থান কঠোর হলেও তাঁদের ফতোয়ায়ও বলা হয়েছে, একান্ত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে।
(দারুল উলুম দেওবন্দ, ফতোয়া নং ৫৪৩/৫৩২-এন, ফিকহি মাকালাত, খণ্ড ৪)
ফলে নিছক বাণিজ্যিক লাভের জন্য নিজের চেহারা এআইয়ে দেওয়ার আগে এই মতভেদের বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। তাকওয়ার দাবি হলো, যেহেতু হারামের পক্ষেও মত আছে, তাহলে এ পথে উপার্জনের চিন্তাই না করা।
বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি তোলা : বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি তোলার উদ্দেশ্য হলো, কাউকে তার পণ্যের প্রচারণার জন্য নিজের ছবি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া। তারা সেটাকে অনলাইনের পাশাপাশি প্রিন্ট করে বিভিন্ন জায়গায় প্রচারণা চালানো স্বাভাবিক, তাই তা নাজায়েজ কাজে সহযোগিতা করারই শামিল হবে। তা ছাড়া নিজের ছবির স্বত্ব অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে বহু গুনাহের পথ খোলার আশঙ্কা থাকে। দারুল উলুম দেওবন্দের একটি ফতোয়ায় বিজ্ঞাপনের পোস্টারে নারী-পুরুষের ছবি যুক্ত করা এবং তা স্থাপন করাকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে; অন্যের তৈরি অবৈধ ছবিযুক্ত বিজ্ঞাপন প্রচার করাকেও ‘পাপে সহযোগিতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। (দারুল উলুম দেওবন্দ, ফতোয়া নং ১৫৩০/১২৫৩-ডি/১৪৩০)।
যদি বলা হয় যে ভাড়া দেওয়া ছবি কখনো প্রিন্ট করা হবে না, শুধু ভিডিও আকারে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে থাকবে, সেখানেও এআই-কম্পানির কাছে চেহারা ভাড়া দেওয়ার চুক্তির শর্তগুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ। তারা এটাকে কোথায়, কী বিজ্ঞাপনের/কনটেন্টের জন্য ব্যবহার করবে, সেখানে নাজায়েজ বা হারাম কিছু থাকবে কি না এগুলো নিশ্চিত হওয়া জটিল বিষয়।
ফিতনা ও হারাম কনটেন্টের আশঙ্কা : ধরা যাক, ছবি হালাল কাজের জন্য ব্যবহার শর্ত দিয়ে ভাড়া দেওয়া হলো, সে ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা থেকে যায়। সব ক্ষেত্রে এমনটা না ঘটলেও কিছু ক্ষেত্রে চেহারা এআই ডেটা সেটে গেলে সেটি দিয়ে ভবিষ্যতে ব্যক্তির অশ্লীল বা আপত্তিকর ভিডিও তৈরি হতে পারে, এই চেহারা ব্যবহার করে প্রতারণামূলক কনটেন্ট ছড়ানো হতে পারে, কারো বিরুদ্ধে ভুয়া বক্তব্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ছাড়া এমন নাটক বা সিনেমা তৈরি হতে পারে, যা দেখা হারাম। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা আবশ্যক।
শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি যদি জানেন বা প্রবলভাবে আশঙ্কা করেন যে তাঁর চেহারা হারাম কনটেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হবে, তাহলে বিষয়টি আরো গুরুতর। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা কোরো না’
(সুরা : মায়েদা, আয়াত : ২)
তাই হারাম ব্যবহারের সম্ভাবনা জেনেও সীমাহীন অধিকার দিয়ে দেওয়া ‘পাপে সহযোগিতা’র প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে। এবং অনলাইনের জন্য সাধারণত যেসব কনটেন্ট তৈরি হয়, তার বেশির ভাগই গুনাহের উপকরণে ভর্তি থাকে।
পর্দা ও দৃষ্টির বিধান : এআইয়ের কাছে নিজের ছবি ভাড়া দেওয়ার আগে পর্দার বিষয়টিও বিবেচনা করা আবশ্যক। যেহেতু মহান আল্লাহ এটিকে ফরজ করেছেন। কোরআন মুমিন পুরুষ ও নারী উভয়কে দৃষ্টি সংযত করতে নির্দেশ দিয়েছে এবং নারীদের সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা প্রকাশ না করতে সতর্ক করেছে। (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০-৩১)
ফলে এআই বিজ্ঞাপনে কোনো নারীর ছবি এমনভাবে ব্যবহার করা হলে যাতে সাজসজ্জা প্রদর্শন, আকর্ষণ সৃষ্টি বা পর্দার সীমা লঙ্ঘন হয়, তা পৃথকভাবে হারাম হবে। একইভাবে পুরুষের ক্ষেত্রেও অশ্লীলতা, শরিয়তবিরোধী পোশাক বা ফিতনা সৃষ্টি হলে বিধান প্রযোজ্য হবে।
গোপনীয়তার ঝুঁকি : প্রযুক্তিগত দিক থেকেও মুখের ছবি সাধারণ ব্যক্তিগত তথ্যের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল আইডেন্টিটি যাচাই ও নিরাপত্তার রক্ষার ক্ষেত্রে ফেশিয়াল ডেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যত্রতত্র তা অবতার আকারে থাকলে বহু জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মানুষের পাসপোর্টসহ বহু স্পর্শকাতর নথির সঙ্গে ফেশিয়াল আইডেন্টিটির সম্পর্ক রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির সম্মান ও পরিচয় রক্ষাও শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব এআই-তে চেহারা দেওয়ার অনুমতি মানে শুধু একটি ছবি ব্যবহারের অনুমতি নয়; বাস্তবে তা নিজের আইডেন্টিটিতে অন্য কাউকে অংশীদারি দিয়ে বহু ফিতনার রাস্তা খোলার শামিল হতে পারে।
চেহারা ভাড়া দিয়ে উপার্জনের হুকুম : চেহারা ব্যবহারের বিনিময়ে পাওয়া অর্থের হুকুমও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে। যদি মূল কাজই শরিয়তবিরোধী হয় বা হারাম কনটেন্ট তৈরিতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা থাকে, পারিশ্রমিক হালাল হওয়ার প্রশ্ন থাকে না। কিন্তু কোনো গ্রহণযোগ্য মত অনুসারে ছবি ব্যবহার বৈধ হওয়ার পর, নির্দিষ্ট বৈধ কাজে সীমিত চুক্তিতে সেবা দেওয়া হলে পারিশ্রমিকের হুকুম ভিন্ন হতে পারে। তাকওয়ার দাবি হলো, এই পন্থায় উপার্জনই না করা। কারণ বর্তমান প্রযুক্তির বাস্তবতা ও হানাফি ফতোয়ার কঠোর অবস্থান বিবেচনায় প্রয়োজন ছাড়া নিজের চেহারা এআই প্রতিষ্ঠানের কাছে বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া থেকে বিরত থাকাই অধিক নিরাপদ।
মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে হকের ওপর থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মূল লেখক: মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা, কালের কন্ঠ
সংগ্রহে: মোঃ হাবিবুল্লাহ্।
পূর্ব ও পরবর্তী যুগের শীর্ষ আলেমরা এসব হাদিসের আলোকে জীবন্ত প্রাণীর ছবি তৈরির নিষেধাজ্ঞা এবং ফকিহদের মতামত বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তবে আধুনিক ক্যামেরার ছবির হুকুমে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উপমহাদেশের বহু হানাফি আলেমদের মতে, সব ধরনের ছবি আঁকা ও ক্যামেরায় তোলা নাজায়েজ। অন্যদিকে কিছু আরব ও সমকালীন পাকিস্তানি আলেমদের একাংশ ক্যামেরার ছবিকে প্রচলিত হাতে আঁকা ‘তাসবির’ থেকে পৃথক মনে করেন। তাঁদের মতে, ক্যামেরায় তোলা ডিজিটাল ছবি প্রিন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু স্ক্রিনের ফাইলে থাকলে তা জায়েজ।
৬
১০ মন্তব্য