সহকারী অধ্যাপক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৩২ অপরাহ্ণ
শিক্ষাগত নেতৃত্বে যোগাযোগ দক্ষতা
শিক্ষাগত নেতৃত্বে যোগাযোগ দক্ষতা
ডঃ মোঃ সাজ্জাদ হোসেন
পি এইচ ডি (শিক্ষা ব্যবস্থাপনা)
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
আলহাজ্ব আহেদ আলী বিশ্বাসের ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।
দুই বা ততদিন ব্যক্তি দল বা পক্ষের মধ্যে কোন সংবাদ, তথ্য, ভাব, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, মনোভাব ইত্যাদির বিনিময় হলে তাকে যোগাযোগ বলে। যোগাযোগের উপাদানসমূহ হলো- প্রেরক , প্রাপক, বার্তা, মাধ্যম, ফিডব্যাক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন প্রধান বা নেতা (যেমন- প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, প্রশাসক ) শিক্ষক, শিক্ষার্থী অভিভাবক এবং পরিচালনা পর্ষদের সাথে যে প্রক্রিয়ায় সাফল্যজনক ভাবে তথ্য আদান প্র দান করেন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করেন তাকে শিক্ষাগত নেতৃত্বে যোগাযোগ দক্ষতা বলে। যোগাযোগ দক্ষতা হলো নিজের ভাবনা সমূহ পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা এবং অন্যের কথা মনযোগ দিয়ে শোনা।
শিক্ষাগত নেতৃত্বে যোগাযোগের গুরুত্ব-
১.স্পষ্ট নির্দেশনা- শিক্ষক কর্মচারী অভিভাবক পরিচালনা কমিটির সকলের কাছে প্র তিষ্ঠানের লক্ষণ ও পরিকল্পনায় স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করা।
২. সহানুভূতি ও আস্তা শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের অনুভূতি বুঝতে পারা এক পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপন করা যেন তারা প্রধানের কথায় মনে করে যে তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলতা দেখাচ্ছেন এবং তার ওপর আস্থা রাখা যায় ঠিক সেভাবেই যোগাযোগ করতে হবে।
৩. দ্বন্দ্ব সমাধান – প্রতিষ্ঠানের ভিতর কোন ভুল বোঝাবুঝি বা সমস্যা তৈরি হলে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা।
৪. প্রতিষ্ঠানের সকলকে একসাথে নিয়ে একটি সুন্দর ও কার্যকর শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, সকলকে অনুপ্রাণিত করা। সকলে যেন শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জনে অনুপ্রেরণা লাভ করে।
শিক্ষাগত নেতৃত্ব সম্পর্কিত কিছু দক্ষতা-
১. উৎসহ মূলক মনোভাব ও আচরণ
২. তথ্য সহ সহায়তামূলক বার্তা-
৩. বার্তা এবং মাধ্যমের বিশ্বস্ততা নিশ্চিতকরণ।
৪. ভিন্ন ভিন্ন শ্রোতার জন্য বোধগম্য ও উপযোগী বার্তা।
৫. ডিজিটাল চ্যানেলেগুলিতে পরিপূর্ণ ও আকর্ষণীয় উপস্থিতি বজায় রাখা।
৬. নতুন প্রযুক্তি দ্রুততার সাথে একীভূত করা।
শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগ-
ক. শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ-
১. নিয়মিত মত বিনিময় সভা- এখানে একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ব্যবস্থা করবেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শ্রেণী প্রতিনিধি বা স্টুডেন্ট ক্যাবিনেট এর সাথে নিয়মিত সভা করবেন এবং প্রয়োজন বোধে একক স্টুডেন্টদের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনা করবেন।
২. Digital notice board- Google workspace এর মত platform ব্যবহার করে digital notice board বা গ্রুপ তৈরি করা , যেতে দ্রুত সব তথ্য শিক্ষার্থীদের জানানো যায়।
৩. স্টুডেন্ট রিলেশন কর্মকর্তা নিযুক্ত- তিনি কোন সিনিয়র শিক্ষককে স্টুডেন্টদের সাথে যোগাযোগ বা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও কাজ করার জন্য নিয়োজিত করতে পারেন।
খ. শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ-
১. সাপ্তাহিক বা মাসিক মিটিং- নিয়মিত স্টাফ মিটিং করে পাঠদানের অগ্রগতি ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যায়।
২. পেশাগত উন্নয়ন কর্মশালা- শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্য বস্থা করা, ইন- হাউস ট্রেনিং, পাঠ চক্র ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
৩. ডিজিটাল কমিউনিকেশন গ্রুপ- What app বা Slack এর মত মেসেজিং অ্যাপে এ শিক্ষকদের অফিশিয়াল গ্রুপ তৈরি করে জরুরি তথ্য আদান প্রদান করা।
গ. অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ-
১. নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ- প্রতি টার্ম বা সেমিস্টারে অন্তত একবার অভিভাবক সমাবেশ (PTA Meeting) আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন নিয়ে আলোচনা করা।
২. প্রগ্রেস রিপোর্ট ও ওয়ান- টু - ওয়ান মিটিং।
৩. SMS, Email Service- জরুরী নোটিশ , উপস্থিতি এবং পরীক্ষার ফলাফল জানানোর জন্য বা ব্যবহার করা।
৪. সমন্বিত বা Digital Platform ব্যবহার- স্কুল ম্যা নেজমেন্ট সিস্টেম এ Edmodo এর মত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা Software ব্যবহার করা, যার মাধ্যমে শিক্ষক ,শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই এই প্লাটফর্মে যুক্ত হতে পারে। আবার ওয়েবসাইট ব্যবহার করা।
ঘ. স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটির সাথে সম্পর্ক-
১. সমন্বয় সভা- UNO, DC, TEO ও কমিউনিটি নেতৃত্ব স্থা নীয় ব্য ক্তিদের সাথে নিয়মিত সমন্বয় ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা।
২. অভিভাবক- শিক্ষক সমিতি (PTA) সভায় অভিভাবকদের সম্পৃক্তকরণ ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের মতামত গ্রহণ।
যেমন- বার্ষিক শিক্ষা সফর, সংস্কৃতি কার্যক্রম, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ইত্যাদি কাজে তাদের সম্পৃক্তকরণ ও মতামত গ্রহণ করা।
৩. সহযোগিতামূলক কার্যক্রম- স্থানীয় সামাজিক ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেতুবন্ধন তৈরি করা।
ঙ. গণমাধ্যম ও তথ্য প্রকাশ-
এ বিষয়ে শিক্ষাগত নেতৃত্বের বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের খুব সংবেদনশীল ভূমিকা রয়েছে। উনি যথেষ্ট কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার সাথে এই সমস্ত সংস্থার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। যেমন -
১. তথ্য অধিকার আইন- ২০০৯ অনুসারে তিনি প্রয়োজনীয় তথ্য যথেষ্ট বিবেচনা সাথে গণমাধ্যমকে দিবেন।
২. গণমাধ্যমের সাথে যোগাযোগ- প্রতিষ্ঠানের যেকোনো অর্জন ক্রিয়া বা সংস্কৃতি উৎসবের খবর স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের প্রেস রিলিজ আকারে প্রকাশ করবেন।
৩. ডিজিটাল মাধ্যম ও নোটিশ বোর্ড- প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে নিয়মিত নোটিশ ফলাফল ও কার্যক্রমের ছবি প্র কাশ করা।
চ. অভিযোগ নিস্পত্তিকরণ পদ্ধতি-
শিক্ষাগত নেতৃত্বে বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের যোগাযোগের এটাও একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বিভিন্ন অভিযোগ নিষ্পত্তের ক্ষেত্রেও যোগাযোগ দক্ষতা প্রদর্শন করবেন। এখানে কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে-
১. সিটিজেন চার্টার্ড- প্রতিষ্ঠানের সেবা ও নিয়মকানুন, সেবা প্রাপ্তির সময়সীমা, সেবা প্রাপ্তির ফি ইত্যাদি উল্লেখ করে দৃশ্যমান স্থানে ‘সিটিজেন চার্টার্ড’ প্রদর্শন বোর্ড করবেন।
২. মতামত ও অভিযোগ বাক্স স্থা পন।
৩. ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা- অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ‘অভিযোগ নিষ্পত্তিক কর্মকর্তা’ হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া।
কার্যকর যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা সমূহ-
ক) সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতা যেমন- নেতিবাচক সংগঠনিক পরিবেশ , যোগাযোগ নীতিমালার অনুপস্থিতি, সাংগঠনিক স্তরের আধিক্য, তথ্যের পরিশ্রুতি।
খ) ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা যেমন- ব্যক্তির পার্থক্য, প্রত্যক্ষণগত পার্থক্য, ভয় বা ভীতি, পূর্ব ধারণার সাধারণ প্রয়োগ, হ্যালো প্রভাব, অমনোযোগ।
গ) ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা যেমন- বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানীয় বা জটিল ভাষা ব্যবহার করা।
ঘ) অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা যেমন- তথ্য ভারাক্রান্ত অবস্থা, ক্রুটিপূর্ণ প্রকাশ, মর্যাদা ও ক্ষমতাগত পার্থক্য, পরিবর্তনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব, শোরগোল ইত্যাদি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন প্রধান বা নেতা এ সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সমূহ বিবেচনা করে যোগাযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করলে তিনি একজন সফল যোগাযোগকারী হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং পেশাগত জীবনে সাফল্য লাভ করবেন।
৮
৮ মন্তব্য