Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:১২ পূর্বাহ্ণ

অ্যাবসার্ড বা Absurd-এর ধারণা

বিখ্যাত দার্শনিক আলবেয়ার কামু শেষপর্যন্ত জীবনের কোনো সহজ ও চূড়ান্ত অর্থ খুঁজে পাননি। বরং তাঁর দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল: "যদি মহাবিশ্বের নিজের কোনো নির্ধারিত অর্থ না থাকে, তাহলে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবে?"


কামুর কাছে এখানেই আসে অ্যাবসার্ড বা Absurd-এর ধারণা। আমরা মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মৃত্যুর কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা খুঁজি। কিন্তু মহাবিশ্ব আমাদের সেই উত্তর দেয় না। মানুষের অর্থের আকাঙ্ক্ষা আর মহাবিশ্বের নীরবতার এই সংঘর্ষ থেকেই জন্ম নেয় অ্যাবসার্ড।


তাঁর বিখ্যাত বই The Myth of Sisyphus-এ তিনি সিসিফাসের গল্প ব্যবহার করেন। সিসিফাসকে দেবতারা এমন শাস্তি দিয়েছিল যে তাকে একটি বিশাল পাথর পাহাড়ের চূড়ায় তুলতে হবে, কিন্তু পাথরটি আবার নিচে গড়িয়ে পড়বে। তারপর তাকে আবার তুলতে হবে, চিরকাল।


কামুর কাছে মানুষের জীবনও অনেকটা এমনই। আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি, কাজ করি, সম্পর্ক তৈরি করি, স্বপ্ন দেখি, আবার একই চক্রে ফিরে আসি। একসময় মৃত্যু এসে সবকিছুর সমাপ্তি ঘটায়। আমাদের বিদায়।


তাহলে কি জীবন অর্থহীন? এখানে কামুর উত্তর ছিল একটু অন্যরকম।হতিনি বললেন, জীবনের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ না থাকলেই জীবন মূল্যহীন হয়ে যায় না। বরং এই সত্যকে স্বীকার করেই বেঁচে থাকা সম্ভব।


তিনি কখনোই নিজেই নিজেকে শেষ করাকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেননি। আবার কোনো অন্ধ, চূড়ান্ত অর্থের ওপর ভর করে অ্যাবসার্ড বাস্তবতা থেকে পালানোর পক্ষেও ছিলেন না। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল revolt, অর্থাৎ অর্থহীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের জীবনকে গ্রহণ করা।


এই কারণেই সিসিফাস তাঁর কাছে পরাজিত মানুষ নয়। বরং এমন একজন মানুষ, যে নিজের অবস্থাটা বুঝেও পাথর ঠেলেই যাচ্ছে।


কামুর বিখ্যাত ভাবনার সারকথা হলো— "আমাদের হয়তো মহাবিশ্বের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু আমরা কীভাবে বাঁচব, কী ভালোবাসব, কী সৃষ্টি করব এবং কোন মুহূর্তকে মূল্য দেব সেই সিদ্ধান্তটাই আমাদের।


The Stranger-এ কামু আবার দেখান, সমাজ যেভাবে জীবনের অর্থ, নৈতিকতা ও অনুভূতির নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করে, তার সঙ্গে একজন মানুষের বিচ্ছিন্নতা কতটা গভীর হতে পারে।


আর The Plague-এ তাঁর চিন্তা আরও মানবিক হয়ে ওঠে। সেখানে কোনো মহৎ মহাজাগতিক অর্থের নিশ্চয়তা না থাকলেও মানুষ অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ পৃথিবী আমাদের কোনো চূড়ান্ত উদ্দেশ্য না দিলেও আমরা একে অপরের জীবনে অর্থ তৈরি করতে পারি।


আমার কাছে কামুর দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটা এখানেই। তিনি বলেননি: “জীবনের কোনো অর্থ নেই, তাই কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়।”


বরং তাঁর চিন্তাকে এভাবে বোঝা যায়: হয়তো মহাবিশ্বের কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই। কিন্তু সেই কারণে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা, সৃষ্টি কিংবা একটি মানুষের পাশে দাঁড়ানো অর্থহীন হয়ে যায় না।


আমরা অর্থ খুঁজে পাই না বলেই হয়তো নিজেরাই অর্থ তৈরি করি। আর সিসিফাসের মতো, পাথরটি আবার নিচে গড়িয়ে পড়বে জেনেও তাকে পাহাড়ের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই হয়তো মানুষের এক অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে।


মন্তব্য করুন

ব্লগ