Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি প্রকৃতির গোপন সীমা



একটি ইলেকট্রনকে আপনি ঠিক কোথায় আছে জানতে চান। সমস্যা হলো, যত নিখুঁতভাবে তার অবস্থান জানার চেষ্টা করবেন, তার গতিবেগ বা ভরবেগ সম্পর্কে আপনার অনিশ্চয়তা তত বেড়ে যাবে।


আর এটা কোনো খারাপ যন্ত্রের সমস্যা নয়। প্রকৃতির কোয়ান্টাম নিয়মই এমন। সেই ১৯২৭ সাল। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান তখনও একেবারে নতুন, আর মাত্র ২৫ বছর বয়সী জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এমন একটি ধারণা সামনে আনলেন, যা নিউটনের বহু পুরোনো ‘সবকিছু নির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব’ ধরনের ধারণাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল। 


নীতিটির বিখ্যাত রূপ: Δx · Δp ≥ ħ/2 

(এখানে ħ হলো h/2π, যেখানে h হলো প্লাঙ্ক ধ্রুবক)


অর্থাৎ, কোনো কোয়ান্টাম কণার অবস্থান এবং ভরবেগ এদুটিকে একই সঙ্গে ইচ্ছেমতো নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। 


কিন্তু এখানেই গল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশ।হাইজেনবার্গ এই ধারণাটি বোঝাতে একটি কাল্পনিক গামা-রে মাইক্রোস্কোপের কথা ভাবলেন। কল্পনা করুন, আপনি একটি ইলেকট্রনকে দেখতে চাইছেন। অত্যন্ত ক্ষুদ্র জিনিস দেখার জন্য আপনার দরকার খুব ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো। তাই হাইজেনবার্গ গামা রশ্মির মতো উচ্চ-শক্তির ফোটন ব্যবহার করার কথা ভাবলেন।


কিন্তু সেই ফোটন যখন ইলেকট্রনের সঙ্গে ধাক্কা খাবে, তখন ইলেকট্রনের ভরবেগ বদলে যাবে। অর্থাৎ, ইলেকট্রনকে যত ভালোভাবে দেখতে যাবেন, তাকে তত বেশি বিরক্ত করবেন।  তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আছে।


 অনিশ্চয়তা নীতিকে শুধু মাপার সময় যন্ত্র কণাটিকে ধাক্কা দেয় ঠিক এভাবে বোঝানো পুরোপুরি ঠিক নয়। আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সে অবস্থান ও ভরবেগের অপারেটর পরস্পরের সঙ্গে commute করে না। সেখান থেকেই মৌলিক অনিশ্চয়তার গাণিতিক সম্পর্ক আসে। 


আরও আশ্চর্যের বিষয়, হাইজেনবার্গের মূল ১৯২৭ সালের কাজটি আজকের পরিচিত গাণিতিক রূপে পুরোপুরি নির্ভুল ছিল না। পরে Earle Kennard একই বছর অনিশ্চয়তা সম্পর্কের একটি কঠোর গাণিতিক formulation দেন। 


ইতিহাসও বেশ নাটকীয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭-এ হাইজেনবার্গ তার বন্ধু ও সহকর্মী উলফগ্যাং পাউলিকে ১৪ পৃষ্ঠার একটি চিঠিতে নতুন ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। মার্চে তিনি গবেষণাপত্রটি প্রকাশের জন্য জমা দেন। নিলস বোর তার গামা-রে মাইক্রোস্কোপের ব্যাখ্যায় কিছু সমস্যা দেখতে পেলেও মূল অনিশ্চয়তা সম্পর্ককে সঠিক বলে মেনে নেন। 


আর একটি দারুণ তথ্য হলো—হাইজেনবার্গ প্রথমদিকে ইংরেজির uncertainty শব্দটি ব্যবহার করেননি। তার ১৯২৭ সালের লেখায় Ungenauigkeit বা অস্পষ্টতা/অসুনির্দিষ্টতার মতো শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল; পরবর্তীতে uncertainty নামটিই প্রতিষ্ঠিত হয়। 


এই নীতির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এটিই: কোয়ান্টাম জগতে প্রকৃতি সব প্রশ্নের উত্তর এমনভাবে দেয় না যে আমরা একই সঙ্গে একটি কণার ‘ঠিক অবস্থান’ এবং ‘ঠিক গতিপথ’ লিখে ফেলতে পারব।


প্রকৃতি যেন খুব ছোট স্কেলে এসে বলে: “তুমি আমাকে যতটা নির্দিষ্ট করে জানতে চাইবে, প্রকৃতির নিয়ম ততটাই তোমাকে মনে করিয়ে দেবে যে সবকিছু একই সঙ্গে নির্দিষ্ট নয়।”


আর এই অদ্ভুত ধারণাটিই আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। হাইজেনবার্গ ১৯৩২ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পান, মূলত কোয়ান্টাম মেকানিক্স সৃষ্টিতে তাঁর অবদানের জন্য। এক অদ্ভুত জগতের গল্প যাঁর হাতেই জীবন্ত হয়ে ওঠে।


মন্তব্য করুন

ব্লগ