সহকারী শিক্ষক
৩১ আগস্ট, ২০২৬ ০১:৪০ অপরাহ্ণ
হাওরের স্কুলঘণ্টা যখন জলের সুরে বাজে

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। হাওরের বুকজুড়ে নরম কুয়াশার চাদর। দূরে একটি ছোট নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। নৌকার সামনের দিকে বসে আছে কয়েকজন কিশোর-কিশোরী। কারও হাতে বই, কারও কোলে ব্যাগ। নৌকার মাঝি বৈঠা টানছেন আর পানির ওপর ভাঙা ভাঙা সূর্যের আলো যেন তাদের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ একটি ছেলে বইয়ের ভেতর থেকে মুখ তুলে দূরের একটি টিনের ছাদওয়ালা ভবনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওই যে, আমাদের স্কুল।”
নৌকাটি এগিয়ে চলে। চারদিকে শুধু পানি আর আকাশ। কোথাও কোথাও সবুজ গাছপালায় ঢাকা গ্রামকে মনে হয় জলরাশির বুকে ভাসমান দ্বীপ। দূরে সাদা বকের দল উড়ে যায়। বাতাসে হাওরের নিজস্ব গন্ধ। শিশুরা নৌকার দোলার সঙ্গে গল্প করে, কেউ কবিতা মুখস্থ করে, কেউ পরীক্ষার পড়া দেখে। তাদের কাছে নৌকা শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, নৌকাই যেন স্কুলবাস। আর হাওর, সেই বিশাল জলভূমি, তাদের প্রতিদিনের পথ।
কিন্তু দৃশ্যটি যতটা সুন্দর, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের শিক্ষার এক গভীর প্রশ্ন। এই শিশুরা কি সমতলের শিশুদের মতো একই বাস্তবতায় শিক্ষা গ্রহণ করে? তাদের বিদ্যালয়ের ঘণ্টা কি শুধু নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বাঁধা, নাকি প্রকৃতিরও একটি নিজস্ব সময়সূচি আছে? হাওরের পানি যখন বাড়ে, জীবন বদলে যায়। আবার পানি যখন নেমে যায়, তখনও জীবন আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। পথ বদলায়, কাজ বদলায়, পরিবারের অর্থনীতি বদলায়, শিশুর দায়িত্বও বদলে যায়। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো প্রায় একই ক্যালেন্ডার হাতে নিয়ে সব ভূগোলের জন্য একই উত্তর লিখতে চায়।
২২ আগস্ট ২০২৬। সারা দিন মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনার হাওরের বুক চিরে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আমাকে এই প্রশ্নের সামনে নতুন করে দাঁড় করিয়েছে। প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দর্য দেখতে বেরিয়েছিলাম। হাওরের হাওয়া খাব, জলরাশির সঙ্গে কথা বলব, দূরের গ্রামগুলো দেখব, নৌকার দোলায় একদিন কাটাব, এ ছিল ভ্রমণের সহজ পরিকল্পনা; কিন্তু দিন শেষে মনে হলো, আমি শুধু প্রকৃতি দেখিনি; আমি দেখেছি বাংলাদেশের এক ভিন্ন জীবনব্যবস্থা। যেখানে আকাশ বড়, জল বড়, দূরত্ব বড়, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন কোনো অংশে ছোট নয়।
মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার
কখনো মনে হয়েছে, আকাশ যেন পানির ওপর নেমে এসেছে। কখনো দূরের গাছপালাকে মনে হয়েছে নীল জলরাশির মধ্যে সবুজ স্বপ্নের দ্বীপ। কোথাও মাছ ধরার নৌকা, কোথাও যাত্রীবাহী ট্রলার, কোথাও বিদ্যালয়গামী শিশু। বাতাসের সঙ্গে জলের ঢেউয়ের এক অদ্ভুত সংগীত। সেই সংগীতের মাঝেই বারবার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের শিক্ষানীতির মানচিত্রে এই জলরাশি কি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে?
মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলী কেবল চারটি উপজেলা নয়। এরা হাওরের চারটি ভিন্ন বাস্তবতা, আবার একই ভূগোলের চারটি অধ্যায়। নিকলী থেকে হাওরের উন্মুক্ত জলরাশি, মিঠামইনের জনপদ, অষ্টগ্রামের বিস্তৃত জলপথ এবং ইটনার ভাটি অঞ্চলের জীবন মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনও পরিবর্তিত হয়। সেই পরিবর্তনের বাইরে স্কুলিংকে রাখা সম্ভব নয়।
মিঠামইনের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর নামই হাওরের বিস্তৃত শিক্ষাবাস্তবতার একটি মানচিত্র তৈরি করে। এখানে রয়েছে হাজি তায়েব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, তমিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঘাগড়া এম এ গণি উচ্চ বিদ্যালয়, এম এ গণি ভূঞা উচ্চ বিদ্যালয়, গোপদীঘি জে এন উচ্চ বিদ্যালয়, কাঞ্চনপুর হাওর উচ্চ বিদ্যালয়, কাটখাল উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকী ফুলবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ধলাই বাগাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, চারীগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় এবং বৈরাটি এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উচ্চারণ করলেই বোঝা যায়, শিক্ষা এখানে শুধু একটি ভবনের ভেতরের ঘটনা নয়; এটি বিস্তৃত জনপদ, জলপথ ও মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত।
ইটনায় রয়েছে মহেশ চন্দ্র সরকারি মডেল শিক্ষা নিকেতন, রাজেন্দ্র আশালতা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, থানেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়, জয়সিদ্ধি উচ্চ বিদ্যালয়, ধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়, চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, এলংজুরী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, লাইমপাশা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ইটনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান। এর অনেকগুলো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ও মৌসুমি বাস্তবতা একে অন্যের মতো নয়। তাই একই উপজেলার সব বিদ্যালয়ের জন্যও এক ধরনের স্কুলিং সমাধান যথেষ্ট নাও হতে পারে।
অষ্টগ্রামের শিক্ষার মানচিত্রে রয়েছে হক সাহেব উচ্চ বিদ্যালয়, কাদিরপুর এস এম নাথ উচ্চ বিদ্যালয়, আব্দুল ওয়াদুদ উচ্চ বিদ্যালয়, বাঙ্গালপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, কাস্তুল এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, আদমপুর দেওয়ান আলী উচ্চ বিদ্যালয়, আব্দুল্লাহপুর হাফিজ আলী উচ্চ বিদ্যালয়, অষ্টগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং অষ্টগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নিকলীর ক্ষেত্রেও রয়েছে উপজেলা সদর ও হাওরসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যেগুলোর যোগাযোগ ও শিক্ষার্থী উপস্থিতির ধরন মৌসুমভেদে পরিবর্তিত হয়। তাই নিকলীসহ চার উপজেলার সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্যালয়ভিত্তিক দুর্গমতা ও স্কুলিং ম্যাপ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। হাওরাঞ্চলের সব বিদ্যালয় সমানভাবে দুর্গম নয়। নতুন সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে কিছু এলাকায় যাতায়াত আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। আবার একই উপজেলার কিছু বিদ্যালয় বর্ষায় নৌকাযোগে সহজে পৌঁছানো গেলেও বর্ষা শেষে তাদের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। অতএব, শুধু মানচিত্র দেখে কিংবা দূরত্ব মেপে হাওরের শিক্ষাসমস্যা বোঝা যাবে না। প্রয়োজন প্রতিটি বিদ্যালয়ের জীবন্ত বাস্তবতা জানা।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি এসেছে মাঠপর্যায়ের একজন প্রধান শিক্ষকের অভিজ্ঞতা থেকে। প্রধান শিক্ষক শিরিনা খাতুন জানিয়েছেন, বর্ষাকালে তাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ পর্যন্ত থাকে। শুনতে বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কারণ আমরা সাধারণত ধরে নিই, বর্ষা মানেই হাওরের বিদ্যালয় বন্ধ অথবা শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় ধারণার অনুগত নয়।
বর্ষার সময় চারদিকে পানি থাকায় শিক্ষার্থীরা নৌকাযোগে তুলনামূলক সহজে বিদ্যালয়ে আসতে পারে। হাওরের মানুষ জলের সঙ্গে লড়াই করে না, তারা জলের সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছে। পানি বাড়লে তাদের যোগাযোগের ধরন বদলায়। যেখানে শুকনো মৌসুমে কাদা, ভাঙা পথ বা দীর্ঘ হাঁটার বাধা থাকে, সেখানে বর্ষায় নৌকা অনেক সময় সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি করে। শিশুদের কাছে তখন নৌকা হয়ে ওঠে স্কুলবাস।
কিন্তু বর্ষা শেষে শুরু হয় আরেক গল্প। পানি নেমে যায়, নৌপথের সুবিধা কমে আসে, কৃষিজীবন ব্যস্ত হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী বাবা মায়ের সঙ্গে কৃষিকাজে সাহায্য করে। কেউ পারিবারিক কাজে, কেউ গৃহস্থালির বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত হয়। ফলে বর্ষাকালের প্রায় ৯০ শতাংশ উপস্থিতির তুলনায় বর্ষা-পরবর্তী সময়ে উপস্থিতি কমে যেতে পারে। এই বাস্তবতা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দেয়। হাওরে বর্ষা সব সময় শিক্ষার শত্রু নয়, আবার শুষ্ক মৌসুম সব সময় শিক্ষার সবচেয়ে বড় বন্ধু নয়।
এই একটি তথ্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে হাওরাঞ্চলের জন্য নতুন স্কুলিং দর্শনের প্রয়োজনীয়তা।
আরও জানা গেছে, একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অভিজ্ঞতায় বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়ার জন্য কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব স্কুল ফান্ড থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। এই ব্যয় ছোট নয়। একটি বিদ্যালয়ের সীমিত তহবিল থেকে এমন অর্থ পরিবহনে চলে গেলে পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষাসামগ্রী, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং শেখার পরিবেশ উন্নয়নের জন্য অর্থ কমে যায়।
তবে এখানেও আমাদের চিন্তা সতর্ক হতে হবে। যদি এই পরিবহন ব্যয়ের ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৯০ শতাংশে পৌঁছে যায়, তাহলে এটিকে কেবল খরচ বলা যাবে না। এটি শিক্ষায় বিনিয়োগ। প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগের পুরো বোঝা কেন একটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল বহন করবে? হাওরের বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে যে অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি হচ্ছে, তার একটি ন্যায়সংগত অংশ রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।
এখানেই আমি একটি নতুন ধারণা প্রস্তাব করতে চাই: হাওর স্কুলিং মডেল।
এই মডেলের প্রথম ভিত্তি হবে মৌসুমভিত্তিক উপস্থিতির তথ্য। কোন বিদ্যালয়ে বর্ষায় উপস্থিতি বেশি, কোনটিতে কম, বর্ষা শেষে কখন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে, কৃষি মৌসুমে কোন বয়সের শিক্ষার্থীরা বেশি অনুপস্থিত থাকে, এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করতে হবে। জাতীয় গড় দিয়ে হাওরের বাস্তবতা বোঝা যাবে না। প্রয়োজন স্কুলভিত্তিক তথ্য।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন নমনীয় একাডেমিক ক্যালেন্ডার। এর অর্থ শিক্ষার দিন কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং যে সময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি, সেই সময়কে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। যদি কোনো বিদ্যালয়ে বর্ষাকালে উপস্থিতি ৯০ শতাংশ হয়, তাহলে সেই মৌসুমে পূর্ণমাত্রার শ্রেণিকক্ষ শিক্ষা, ব্যবহারিক কার্যক্রম, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ সম্পন্ন করা যেতে পারে। আবার বর্ষা শেষে কৃষিকাজের ব্যস্ততায় উপস্থিতি কমলে সকাল বা বিকেলের নমনীয় সেশন, অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস এবং ছোট গ্রুপে পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, গঠন করতে হবে হাওর শিক্ষার্থী নৌপরিবহন সহায়তা তহবিল। বিদ্যালয়ের দুর্গমতা, শিক্ষার্থী সংখ্যা, নৌপথের দূরত্ব ও মৌসুমি প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি বরাদ্দ দিতে হবে। প্রতিটি নৌযানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। লাইফ জ্যাকেট, প্রশিক্ষিত নৌচালক, নির্ধারিত রুট এবং আবহাওয়া সতর্কতা ব্যবস্থাকে শিক্ষার্থী পরিবহনের অংশ করতে হবে। হাওরের শিশুরা বিদ্যালয়ে যাবে, কিন্তু তাদের শিক্ষার পথে জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
চতুর্থত, প্রয়োজন হাওর স্কুল ট্রান্সপোর্ট গ্রান্ট এবং স্কুলিং রিকভারি গ্রান্ট। পরিবহন ও শিক্ষা দুটি আলাদা খাত হিসেবে দেখতে হবে। একদিকে শিক্ষার্থীর নিরাপদ যাতায়াত, অন্যদিকে মৌসুমভিত্তিক শেখার ঘাটতি পূরণের জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ থাকতে হবে।
পঞ্চমত, চার উপজেলার সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে একটি দুর্গমতা সূচকের আওতায় আনতে হবে। উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব, সারা বছরের সড়ক যোগাযোগ, বর্ষায় নৌপথের ওপর নির্ভরতা, যাতায়াতের সময়, আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি এবং শিক্ষার্থীর উপস্থিতির মৌসুমি পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়কে শ্রেণিবিন্যাস করা যেতে পারে। তখন আর অনুমানের ভিত্তিতে বলা হবে না, কোন স্কুল দুর্গম। তথ্য বলবে কোন বিদ্যালয়ের জন্য কী ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ষষ্ঠত, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে; কিন্তু প্রযুক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা নয়। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট যেখানে আছে সেখানে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করা যাবে। যেখানে নেই, সেখানে মুদ্রিত লার্নিং প্যাকেজ, শিক্ষক তৈরি ওয়ার্কশিট এবং কমিউনিটি ভিত্তিক শিক্ষাগোষ্ঠী কার্যকর হতে পারে। হাওরের প্রতিটি বাড়িতে সমান প্রযুক্তি নেই। তাই সমাধানও একরঙা হতে পারে না।
সপ্তমত, শিক্ষকদের জন্য বিশেষ নীতি প্রয়োজন। দুর্গম হাওরাঞ্চলের শিক্ষককে কেবল উপস্থিতির খাতা দিয়ে মূল্যায়ন করলে বাস্তবতার প্রতি অবিচার হবে। নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত সহায়তা, দুর্গমতা প্রণোদনা এবং স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যখন বুঝবেন কোন মৌসুমে শিক্ষার্থী আসে, কখন অনুপস্থিত থাকে, কোনো পরিবারের সন্তান কৃষিকাজে যুক্ত হয়, তখন তিনি শুধু পাঠদান করবেন না, শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন রক্ষার পরিকল্পনাও করতে পারবেন।
হাওর ট্যুরের সেই দিনের শেষ বিকেলে সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ছিল। জলের ওপর লম্বা হয়ে যাচ্ছিল আলোর রেখা। দূরে কয়েকটি নৌকা ঘরে ফিরছিল। মনে হচ্ছিল, সারা দিনের হাওর যেন আমাকে একটি কথাই বারবার বলছে: “আমাকে সমতলের নিয়মে বোঝার চেষ্টা করো না।”
সত্যিই তো, হাওরকে বুঝতে হলে তার জলের ভাষা বুঝতে হবে। বর্ষার সুবিধা বুঝতে হবে, বর্ষা-পরবর্তী সংকট বুঝতে হবে। একটি শিশুর হাতে বই আছে কি না, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই শিশু কখন বই খুলতে পারছে, কেন কোনো মৌসুমে বিদ্যালয়ে আসছে এবং কেন অন্য মৌসুমে অনুপস্থিত থাকছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের শিক্ষা নীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত অভিযোজন। সমতার অর্থ সবাইকে একই জিনিস দেওয়া নয়। সমতার অর্থ হলো, প্রত্যেককে তার বাস্তবতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়া। মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী ও ইটনার হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য তাই সমতলের অনুকরণে নয়, সমঅধিকারের ভিত্তিতে ভিন্নতর সহায়তা প্রয়োজন।
আজ সময় এসেছে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণের। এই চার উপজেলার নির্বাচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে নিয়ে ‘হাওর অ্যাডাপ্ট স্কুলিং পাইলট চালু করা যেতে পারে। এক বছর ধরে উপস্থিতি, পরিবহন ব্যয়, মৌসুমভিত্তিক শিক্ষার ফলাফল, ঝরে পড়ার হার এবং অভিভাবকদের মতামত সংগ্রহ করা হোক। তারপর প্রমাণের ভিত্তিতে একটি জাতীয় হাওর শিক্ষা মডেল তৈরি করা হোক।
হাওরের স্কুলঘণ্টা সব সময় দেয়ালের ভেতর থেকে বাজতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কখনো সেটি বাজতে পারে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দের মধ্যে, কখনো জলের ঢেউয়ের পাশে, কখনো বর্ষার বাতাসে। কিন্তু ঘণ্টাটি যেন থেমে না যায়।
২২ আগস্টের সেই সারাদিনের হাওরভ্রমণ আমাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যের চেয়ে বড় একটি শিক্ষা দিয়েছে। হাওরের আকাশ বিশাল, জলরাশি অসীম, পথ কখনো অনিশ্চিত, কিন্তু মানুষের শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তার চেয়েও বড়। প্রধান শিক্ষক শিরিনা খাতুনের বলা ৯০ শতাংশ উপস্থিতির গল্প আমাদের শেখায়, আমরা যে সমস্যাকে সমস্যা ভাবছি, তার ভেতরেও কখনো সমাধানের পথ লুকিয়ে থাকে।
বর্ষা এলে স্কুল বন্ধ নয়, হাওরের বাস্তবতা বুঝে স্কুলিং বদলাবে। নৌকা শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, শিক্ষার সেতু হবে। স্কুল ফান্ডের সীমিত অর্থ একা পরিবহনের বোঝা বইবে না, রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে। আর প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার তার গ্রামের অবস্থান বা চারপাশের জলরাশির কারণে কখনো কমে যাবে না।
হাওরের প্রকৃতিকে বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু হাওরের শিশুদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অবশ্যই সম্ভব। সেই কাজটি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী স্বপ্ন নয়। মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী ও ইটনার জলরাশি আজই আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আমরা কি হাওরকে বদলাতে চাই, নাকি হাওরকে বুঝে শিক্ষাকে বদলাতে চাই?
সঠিক উত্তরটি দ্বিতীয়টিই। কারণ হাওরের শিশুরা কোনো বিশেষ করুণা চায় না। তারা চায় এমন একটি বিদ্যালয়, এমন একটি ক্যালেন্ডার এবং এমন একটি রাষ্ট্র, যা তাদের জীবনের বাস্তবতাকে বুঝবে। জল যখন পথ, তখন শিক্ষার পথও জলের সঙ্গে চলতে শিখবে। আর সেদিনই হাওরের বুক থেকে উঠে আসবে বাংলাদেশের শিক্ষার এক নতুন, মানবিক ও অভিযোজনশীল দিগন্ত।


১
১ মন্তব্য