Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:২৮ পূর্বাহ্ণ

কাজী নজরুলের দ্বিতীয় ছেলে বুলবুল মাত্র ৪ বছর বয়সে গুটি বসন্ত রোগে মারা গিয়েছিল।
কাজী নজরুলের দ্বিতীয় ছেলে বুলবুল মাত্র ৪ বছর বয়সে গুটি বসন্ত রোগে মারা গিয়েছিল। ছেলেটাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন নজরুল।
আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে লাশের পাশে বসেই ক্রমাগত কাঁদছিলেন নজরুল। লাশের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়।
ওইদিকে লাশ দাফনের সময়ও ঘনিয়ে আসছিল। বসন্ত রোগীদের লাশ বেশিক্ষণ রাখা যেত না, পচে গন্ধ বের হওয়া শুরু হতো।
শোকাহত নজরুল বুকে অসম্ভব কষ্ট নিয়ে আদরের ছেলের লাশ দাফনের জন্যে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু মাথাভর্তি অজস্র কবিতা থাকলেও পকেটে তখন একটা টাকাও ছিল না।
অথচ লাশ গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া, কাফনের কাপড় এবং গোরস্থানে জমি কেনার জন্যে দরকার ছিল ১৫০ টাকা। সেসময় ১৫০ টাকা মানে অনেক টাকা।
হতভাগা লেখক নজরুলের কাছে সে টাকাটাও তখন ছিল না।
নজরুল এক লাইব্রেরি থেকে আরেক লাইব্রেরিতে ছুটতে লাগলেন টাকার খোঁজে কিন্তু তেমন কেউই টাকা দিতে রাজি হলো না। সবার ধারণা- এই গরিব লেখককে টাকা ধার দিয়ে কি লাভ হবে?
ডি. এম লাইব্রেরি মালিক মায়া করে ৩৫ টা টাকা দিয়েছিল শুধু। তখনও আরও অনেক টাকা বাকি।
ঘরে লাশ রেখে নজরুল গেলেন এক প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক শর্ত দিলো- এই মুহুর্তে একটা কবিতা লিখে দিতে পারলে তারপর টাকা দিবে।
একদিকে আদরের ছেলেটার লাশ পচে যাচ্ছে অন্যদিকে
টাকা যোগাড় করাটাও জরুরি। প্রকাশকের শর্তানুযায়ী নজরুল কবিতা লিখতে বসে গেলেন।
তারপর বিষণ্ণ মন আর কাঁপা কাঁপা হাতে লিখলেন-
'ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি
করুণ চোখে চেয়ে আছে
সাঝের ঝরা ফুলগুলি...
পুরো কবিতাটা লিখে দিয়ে টাকা নিয়ে দৌঁড়ে বাড়ি ফিরলেন নজরুল। ছলছল করা চোখে শেষবারের মতো একনজর দেখে নিলেন আদরের ছেলেটাকে। তারপর সেই টাকা দিয়ে পরম যত্নে গোরস্থানে দাফন করেছিলেন ছেলেটাকে।
কাজী নজরুলের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছিল দুঃখ- দুর্দশায়। ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ছোটবেলায় কাজ করতেন রুটির দোকানে। কারণ দোকানে কাজ করলে একটা রুটি দিতো, সেটা খেয়েই কোনরকম পেট ভরতো তার।
শেষ বয়সে তার অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসাটুকুও করাতে পারেননি শুধুমাত্র সামান্য ক'টা টাকার অভাবে। কোনমতে ছোট্ট ঘরটাতেই দিনরাত কাটতো তাদের।
অনাহারে অর্ধাহারে থেকে থেকে নজরুল নিজেও একসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থ স্ত্রীই তখন বিছানায় আধশোয়া হয়ে নলা তুলে খাইয়ে দিতো তাকে।
তারপর একসময় টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় ২৭ আগষ্টের এক সকালে চিরবিদায় নিলেন নজরুল।
এখন নজরুলের নামে অসংখ্য একাডেমি হয়েছে, তার মৃত্যুদিবসে অজস্র অনুষ্ঠান হয়, সেই অনুষ্ঠানে লাখ লাখ টাকার বাজেটও হয়।
অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় সবাই গলা বড় করে জানায় দেয় তারা অনেক নজরুলপ্রেমী কিন্তু বেঁচে থাকতে এই মানুষটার পাশেই দাঁড়ায়নি কেউ।
আজকে নজরুলের বই বিক্রি করে শত শত প্রকাশক কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে, বড়লোক হয়েছে অথচ একদিন ছেলের পচা লাশ ঘরে রেখে টাকার জন্যে হন্য হয়ে দৌঁড়াতে হয়েছিল তাকে।
এই মানুষটা এতটা দুঃখ নিয়ে জীবন পার করেছেন যে তার দুঃখের পরিমাণ দেখে সবাই হাসিঠাট্টা করে দুখু মিয়া ডাকতো তাকে।
সেই সমস্ত দুঃখকে আলিঙ্গন করেই ২৭ আগস্টের এক সকালে চলে গেলেন দুখু মিয়া। বহু মানুষ তার কবিতার খোঁজ নিয়েছে, কবিতা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে কিন্তু একবুক দুঃখ নিয়ে পরপারে চলে যাওয়া মানুষটার খোঁজ আর নেয়নি কেউ, কেউ না
- কথা কালেক্ট ইব্রাহিম খলিল শাওন
মন্তব্য করুন

ব্লগ