Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪০ অপরাহ্ণ

এসএসসিতে গণিতে কেন এই বিপর্যয়? উত্তরণে কার ভূমিকা কতখানি?




মোহাম্মদ ইমাম হোসেন

মাস্টার ট্রেইনার (গণিত); সহকারী শিক্ষক (গণিত),

চাটিতলা উচ্চ বিদ্যালয়, নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।

 

সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরাবরের মতোই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ গণিত বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে পাসের হার কমার পেছনেও এই একটি বিষয়ই মূল ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত নিয়ে যে ভীতি কাজ করে, তা কেবল পরীক্ষার খাতিরেই নয়, বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সামাজিক মানসিকতার কারণেও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। গণিতে ধারাবাহিক ফলাফল বিপর্যয় কেবল কোনো শিক্ষার্থী বা পরিবারের একক ক্ষতি নয়, এটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অগ্রগতির অন্তরায়। বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিজ্ঞান, রোবোটিকস, প্রকৌশলসহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণিতের মৌলিক জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সংকট দূরীকরণে সমাজের প্রতিটি স্তরের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে:

ফলাফল বিপর্যয়ের মূল কারণসমূহ

·         ভিত্তি দুর্বল থাকা: গণিতে ভালো করার জন্য প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই মৌলিক ধারণা পরিষ্কার থাকা জরুরি। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, ভগ্নাংশ, শতকরা, অনুপাত, বীজগাণিতিক রাশি কিংবা জ্যামিতির মৌলিক ধারণায় দুর্বল থাকা অবস্থায় মাধ্যমিক পর্যায়ে চলে আসে। পরবর্তী শ্রেণিতে নতুন নতুন পাঠ যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দুর্বলতা আরও প্রকট হয়।

·         মুখস্থ করার প্রবণতা: গণিত বোঝার বিষয় হলেও অনেক শিক্ষার্থী সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি না বুঝে কেবল সূত্র, নিয়ম কিংবা নির্দিষ্ট অঙ্কের সমাধান মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করার চেষ্টা করে। প্রশ্নের ধরন সামান্য পরিবর্তিত হলেই তখন তারা সমস্যায় পড়ে।

·         বিষয়ভিত্তিক ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি: শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করতে একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

·         শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের অভাব: একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের মেধা, আগ্রহ ও শেখার গতি এক নয়। কেউ দ্রুত বুঝতে পারে, আবার কেউ একই বিষয় বুঝতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। তাই দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগ না থাকলে তারা ধীরে ধীরে গণিত থেকে পিছিয়ে পড়ে।

·         অহেতুক মনস্তাত্ত্বিক ভীতি: সমাজ ও পরিবার থেকে ছোটবেলা থেকেই ‘গণিত একটি কঠিন বিষয়’ -এমন একটি ভয় শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এ ধরনের মন্তব্য অজান্তেই শিশুর মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ফলে অঙ্ক করার আগেই তার মনে ভয় কাজ করে। অথচ গণিতকে সহজভাবে উপস্থাপন করা গেলে অনেক শিক্ষার্থীই আনন্দের সঙ্গে বিষয়টি শিখতে পারে।

·         যথাযথ অনুশীলনের অভাব: গণিতে দক্ষতা অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিয়মিত অনুশীলন। একটি বিষয় একদিন পড়ে দীর্ঘদিন বিরতি দিলে গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা তৈরি হয় না। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও নিয়মিত চর্চা করা প্রয়োজন।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ভূমিকা: গণিত ভীতি দূর করার মূল চাবিকাঠি

এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে ফলাফল বিপর্যয় ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কাঠামোর চেয়েও শিক্ষকের ব্যক্তিগত ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের অংক সমাধানকারী নন, বরং তিনি একজন মেন্টর, অনুপ্রেরণাদাতা ও পথপ্রদর্শক।

·         বাস্তব উদাহরণ: বাজার করা, টাকা-পয়সার হিসাব, সময়, দূরত্ব, পরিমাপ, স্থাপত্য কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে গণিতের সম্পর্ক তুলে ধরলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টিকে বাস্তব ও সহজ হিসেবে দেখতে শেখে।

·         মুখস্থের বিপরীতে ‘কেন এবং কীভাবে’ শেখানো: শুধু সূত্র মুখস্থ না করিয়ে সূত্রটি কীভাবে এসেছে, কেন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কোন পরিস্থিতিতে এটি প্রয়োগ করতে হবে, তা ব্যাখ্যা করা দরকার।

·         পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ যত্ন: অতি দুর্বল শিক্ষার্থীদের শুরুতেই কঠিন অংক না দিয়ে ছোট ও সহজ সমস্যা সমাধান করতে দেওয়া, যাতে তাদের মধ্যে ‘আমিও পারি’ এই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।

·         ভুল করার স্বাধীনতা দেওয়া: গণিত শেখার ক্ষেত্রে ভুল একটি স্বাভাবিক বিষয়। শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে অপমান বা নিরুৎসাহিত না করে কোথায় ভুল হয়েছে তা বুঝিয়ে দিতে হবে। ভুল থেকেই যে সঠিকটা শেখা যায়, এই মানসিকতা তৈরি করা।

·         সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির সঠিক ধারণা: এসএসসি পরীক্ষার সৃজনশীল প্রশ্ন বা উদ্দীপক কীভাবে পড়ে বুঝতে হয় এবং ‘ক, খ, গ’ অংশের উত্তর কীভাবে সাজাতে হয়, তা বোর্ডে হাতে-কলমে দেখানো।

·         পরীক্ষার কৌশল শেখানো: প্রশ্ন ভালোভাবে পড়া, প্রয়োজনীয় তথ্য চিহ্নিত করা, ধাপে ধাপে সমাধান করা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অনুশীলন করানো প্রয়োজন।

অভিভাবকের করণীয়: ঘরের পরিবেশ ও মানসিক সমর্থন

শুধু বিদ্যালয়ের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে গণিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। বাড়িতেও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

·         ভীতি তৈরি না করা: সন্তানকে গণিত নিয়ে ভয় দেখানো যাবে না। “গণিত তোমার দ্বারা হবে না” কিংবা “গণিত খুব কঠিন” -এ ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে।

·         ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেওয়া: শুধু নম্বরের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে সন্তান বিষয়টি কতটা বুঝেছে, সেটিও জানতে হবে। পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে বকাঝকা না করে কোথায় সমস্যা হয়েছে তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

·         অতিরিক্ত চাপ বা কোচিং নির্ভরতা কমানো: একসঙ্গে অতিরিক্ত কোচিং, টিউটর ও গাইড বইয়ের চাপ না দিয়ে শিক্ষার্থীকে নিজে চিন্তা করে সমস্যা সমাধানের সুযোগ দিতে হবে।

শিক্ষার্থীর করণীয়: কৌশল ও নিয়মিত অনুশীলন

গণিতে ভালো করার জন্য শিক্ষার্থীর নিজের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি।

·         নিয়মিত অনুশীলন: প্রতিদিন সামর্থ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় গণিত চর্চা করা উচিত। একদিন অনেক অঙ্ক করার চেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত অল্প অল্প করে অনুশীলন বেশি কার্যকর।

·         ভুলের খাতা (Mistake Notebook) তৈরি: যেসব অংক প্রথমবারে মিলছে না বা পরীক্ষায় ভুল হচ্ছে, সেগুলো একটি আলাদা খাতায় নোট করে রাখা এবং বারবার অনুশীলন করা।

·         বিগত বছরের প্রশ্ন ও সময় ব্যবস্থাপনা: এসএসসি পরীক্ষার আগে বিগত কয়েক বছরের বোর্ড প্রশ্নগুলো ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধান করার অভ্যাস করা।

·         না বুঝলে প্রশ্ন করা: কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষক, সহপাঠী বা অভিভাবকের সহায়তা নিতে হবে। না বুঝে মুখস্থ করার চেয়ে প্রশ্ন করে ধারণা পরিষ্কার করা অনেক বেশি কার্যকর।

সামাজিক দায়বদ্ধতা: গণিত শিক্ষা কেবল পরীক্ষার নম্বর নয়

গণিতে ধারাবাহিক ফলাফল বিপর্যয় কেবল কোনো শিক্ষার্থী বা পরিবারের একক ক্ষতি নয়, এটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অগ্রগতির অন্তরায়।

·         সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: গণিতকে কেবল একটি ‘কঠিন বিষয়’ হিসেবে সমাজ থেকে ছুড়ে না ফেলে, এটি যে চিন্তাশক্তি ও যুক্তি বিকাশের মাধ্যমএই মানসিকতা তৈরিতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো দরকার।

·         বিনামূল্যে গণিত অলিম্পিয়াড বা ক্যাম্পের আয়োজন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগে গণিত অলিম্পিয়াড, গণিত ক্যাম্প, কুইজ ও আনন্দভিত্তিক গণিত কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি গণিত শেখার আনন্দও তৈরি করবে।

গণিতে ভালো করা কোনো জাদুকরী বিষয় নয়, বরং এটি সঠিক গাইডলাইন এবং নিয়মিত অনুশীলনের ওপর নির্ভরশীল। এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কমাতে হলে শুধু পরীক্ষার আগে বিশেষ প্রস্তুতি নিলেই হবে না। প্রাথমিক স্তর থেকেই গণিতের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। বিদ্যালয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা, অভিভাবকের ইতিবাচক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীর নিয়মিত অনুশীলন নিশ্চিত করতে হবে।

গণিতকে ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, বোঝার ও উপভোগ করার বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে হবে। আজকের একজন গণিতভীত শিক্ষার্থীকে যদি আত্মবিশ্বাসী সমস্যা-সমাধানকারী হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে শুধু এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলই নয়, ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশও আরও শক্তিশালী হবে।

 



 

মন্তব্য করুন

ব্লগ