Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০১:৩১ অপরাহ্ণ

আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরুর গল্প

❤️❤️আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরুর গল্প (পর্ব–৫)

# মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে শিক্ষক হওয়ার যে শিক্ষা পেয়েছি:

বিদ্যালয়ের শিশু জরিপ একটি চলমান কাজ। প্রতি বছরই প্রতিটি বিদ্যালয়কে এই জরিপ সম্পন্ন করতে হয়। এই কাজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—ক্যাচমেন্ট এলাকার প্রতিটি পরিবারের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের সন্তানদের তথ্য সংগ্রহ করা। আর সেই সূত্রেই একজন শিক্ষকের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের এক অদৃশ্য অথচ দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

 আমাকেও প্রতিবছর এই দায়িত্ব পালন করতে হতো।

 # একদিন জরিপের ধারাবাহিকতায় গেলাম জনাব লিচু খান সাহেবের বাড়িতে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছি। এদিকে তিনি বারবার তাঁর ছোট ভাই দবির খানকে ডাকছেন। শীতের সকালের মিষ্টি ঘুম ছেড়ে কে-ই বা সহজে ওঠে! আমি ভাবলাম, কাজ শেষ করে চলে যাই। কিন্তু তিনি বললেন, “একটু অপেক্ষা করুন স্যার।” মজার বিষয় হলো, বয়সে আমি তাঁর চেয়ে অনেক ছোট হলেও তিনি সব সময় আমাকে এই সম্মান দিয়েই সম্বোধন করতেন।

  # কিছুক্ষণ পর তাঁর বড় মেয়ে জেবা এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলো। তিনি হাসিমুখে বললেন, “এইমাত্র গাভী দোহন করে আনা হয়েছে, খেয়ে দেখুন কেমন লাগে।”

 আমি ইতস্তত করছিলাম। তখন তাঁর মা স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, “বাবা, খেয়ে নাও। গরম করার দরকার নেই, এখনও দুধের উষ্ণতা আছে।”

 সেই টাটকা দুধের স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে। শুধু দুধের স্বাদ নয়, মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সেই উষ্ণতাও আজও হৃদয়ে অমলিন।

  # এভাবেই প্রতি বছর কোনো না কোনো পরিবারের সঙ্গে নতুন কোনো স্মৃতি জড়িয়ে যেত। ধীরে ধীরে ছাতারপই গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

  ## বিশেষ করে জনাব আনছার খান সাহেবের বাবা আমার কাছে ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ। তাঁর নির্মল হাসি, আন্তরিক ব্যবহার আর খোঁজখবর নেওয়ার অভ্যাস আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। দেখা হলেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করতেন, “কেমন আছেন? বাবা-মা কেমন আছেন?”

  মনে হতো তিনি যেন আমাদেরই কোনো নিকট আত্মীয়। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর অশেষ রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত রাখুন। আমীন।

২০০৬ সাল — সি-ইন-এড প্রশিক্ষণের নতুন অধ্যায়

""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

  # ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হলো সি-ইন-এড প্রশিক্ষণ—স্থান সুনামগঞ্জ পিটিআই (PTI)। সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের জন্য এই প্রশিক্ষণ ছিল বাধ্যতামূলক।

  পুরো এক বছরব্যাপী এই প্রশিক্ষণ আমার শিক্ষকতা জীবনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।

   নতুন নতুন শিক্ষক বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয়, নতুন অভিজ্ঞতা আর প্রতিদিনের নিয়মতান্ত্রিক জীবন—ক্লাস, খাওয়া, বিশ্রাম, পড়াশোনা—সবকিছুই ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। সবাই একই পোশাকে ক্লাসে উপস্থিত হতাম। সেখানে শিখেছি আধুনিক পাঠদান কৌশল, সার্ভিস রোলের নানা বিষয়, শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শিশু মনোবিজ্ঞান।

   তখন বুঝতে শুরু করলাম, একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না; তিনি শিশুর মন বোঝেন, তার আবেগকে ধারণ করেন এবং তার সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পথ দেখান।

শিখেছিলাম—

* বড় ও ছোট শ্রেণি পরিচালনার ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ,

* একটি আদর্শ শ্রেণিকক্ষের বৈশিষ্ট্য,

* বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শিশুদের সঙ্গে আচরণগত পর্যবেক্ষণ,

* নিরাপদ ও আনন্দময় শিখন পরিবেশ তৈরি করার কৌশল।

  ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম—একজন শিক্ষককে শুধু শিক্ষক হলেই চলে না। তাঁকে কখনো গায়ক, কখনো অভিনেতা, কখনো সাহিত্যিক, কখনো পাঠক, আবার কখনো মনোযোগী শ্রোতাও হতে হয়। সর্বোপরি তিনি শিক্ষার্থীদের রোল মডেল, আবার প্রয়োজন হলে তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

     প্রশিক্ষণের শুরুতে মনে হয়েছিল, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য এত দীর্ঘ প্রশিক্ষণের কী প্রয়োজন? কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে বুঝেছি—প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

  শেষ পর্বে শুরু হলো প্র্যাকটিস টিচিং। পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করে একাধিক প্রশিক্ষকের সামনে পাঠ উপস্থাপন করতে হতো। তখন উপলব্ধি করেছি—শ্রেণি বিন্যাস, নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি, শিশুদের আবেগ জাগিয়ে শিখনফল অর্জন করানো এবং যথাযথ পদ্ধতিতে পাঠ পরিচালনা করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

   ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করানো সত্যিই সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

    অবশেষে সেই কঠিন কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করে আমরা আবার নিজ নিজ বিদ্যালয়ে ফিরে এলাম। হয়তো জ্ঞানের ঝুলি পুরোপুরি কানায় কানায় পূর্ণ করতে পারিনি, কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম অমূল্য অভিজ্ঞতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনেক জ্ঞানী, গুণী ও কর্মঠ সহকর্মীর কাছ থেকে পাওয়া জীবনের রসদ।

  তখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই চিরন্তন বাণীর তাৎপর্য—

            “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো।”

  শিক্ষকতা আমাকে শিখিয়েছে—শেখার কোনো শেষ নেই; প্রতিটি দিনই একজন শিক্ষককে নতুন করে ছাত্র হয়ে উঠতে হয়।(চলবে )

মন্তব্য করুন

ব্লগ