সহকারী শিক্ষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৫৪ অপরাহ্ণ
৫৯ বছর বয়সে গ্র্যাজুয়েট হলেন বেলায়েত

প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে বয়স যে শিক্ষা অর্জনে কোনো বাধা হতে পারে না, তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বেলায়েত হোসেন শেখ। ৫৯ বছর বয়সে তিনি একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ থেকে সফলভাবে স্নাতক (অনার্স) সম্পন্ন করেছেন। জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু করা সম্ভব—তার এই সাফল্য যেন তারই এক উজ্জ্বল প্রতীক।
৪৫ বছর আগে উচ্চশিক্ষা অর্জন ও গলায় টাই পরার যে স্বপ্ন বেলায়েত শেখ দেখেছিলেন, অনার্সের চূড়ান্ত মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষার দিনে অবশেষে তা বাস্তবে রূপ নেয়। গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ভাইভায় অংশ নিতে তিনি ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নেন। এরপর সকালে ক্যাম্পাসে পৌঁছে নির্ধারিত সময়ে ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হন এবং পরীক্ষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
ভাইভা বোর্ডে তাকে চার বছর আগের বেলায়েত এবং বর্তমান বেলায়েতের পার্থক্য জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে তার প্রধান চিন্তা ছিল কীভাবে অনার্স শেষ করবেন। এখন তার উপলব্ধি আন্তরিক ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব।
তবে বেলায়েত শেখের শিক্ষাজীবনের এই যাত্রার গল্পটি মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম তার। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সংকট তার পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের ব্যয়ভার সামলাতে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে তাকে।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে এসএসসি পরীক্ষার্থী থাকাকালে অর্থের অভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি বেলায়েত। পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটি অংশ সংগ্রহ করলেও অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্য সেই অর্থ ব্যয় করতে হয়। এরপর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে হয় তাকে।
দীর্ঘ বিরতির পর ৫০ বছর বয়সে আবারও শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন বেলায়েত শেখ। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে জিপিএ ৪.৪৩ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে জিপিএ ৪.৫৮ পেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুটাও তার জন্য সহজ ছিল না। ইংরেজিতে দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও নিয়মিত পড়াশোনা, অনলাইন অনুবাদসহ বিভিন্ন উপায়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন তিনি। বয়সে অনেক ছোট সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস, স্টাডি ট্যুর ও বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেন। শিক্ষকরাও তাকে নিয়মিত উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন বলে জানান তিনি।
বেলায়েত শেখের বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রিফাত সুলতানা বলেন, তার মধ্যে শেখার আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের কোনো ঘাটতি ছিল না। নিয়মিত গাজীপুর থেকে ক্যাম্পাসে এসে ক্লাস করেছেন তিনি। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য তার জীবন ও প্রচেষ্টা একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স সম্পন্ন করেও থেমে যেতে চান না বেলায়েত শেখ। পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে দৈনিক করতোয়া পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন তিনি। মফস্বল সাংবাদিকদের জীবন ও পেশাগত বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করতে চান তিনি। মাস্টার্স শেষে এ বিষয়ে পিএইচডি করারও পরিকল্পনা রয়েছে তার।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বেলায়েত শেখ বলেন, বয়সকে তিনি কখনো শেখার পথে বাধা হিসেবে দেখতে চান না। নিজেকে এখনও একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই ভাবেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন কিছু শিখে যেতে চান।


৭
৬ মন্তব্য