সিনিয়র শিক্ষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
বহু বছর ধরে পড়াচ্ছি। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠ দিচ্ছি, বোর্ডে লিখছি, নোট দিচ্ছি, পরীক্ষা নিচ্ছি, ফলাফল তৈরি করছি। কিন্তু কখনো কখনো নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি আসলে কী পড়াচ্ছি? আর আমার শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তারা যা শিখছে, তার কতটুকু বুঝতে পারছে, কতটুকু মনে রাখতে পারছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাস্তব জীবনে কতটুকু প্রয়োগ করতে পারছে?
একজন শিক্ষক হিসেবে এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উন্নতি শুরু হয় ঠিক এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো থেকেই।
আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ধরনের বিষয় পড়িয়েছি। কিন্তু এই এক দশকে পৃথিবী কি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে? একেবারেই নয়। গত দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিকস, বিগ ডেটা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান—সবকিছু আমূল বদলে গেছে।
তাহলে আমাদের শ্রেণিকক্ষ কেন এতটা বদলায়নি?
আমরা কি এখনো শিক্ষার্থীদের এমন একটি পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করছি, যে পৃথিবী ইতোমধ্যে বদলে গেছে?
শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ করা? সিলেবাস শেষ করা? পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া? নাকি একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে নতুন পরিস্থিতিতে চিন্তা করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং শেখা জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে?
আন্তর্জাতিক শিক্ষাচিন্তাতেও এখন বিষয়টি স্পষ্ট—স্কুলে উপস্থিত থাকা আর শেখা এক বিষয় নয়। বিশ্বব্যাংক বহু আগেই সতর্ক করেছে যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হলো learning outcome; অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা কত বছর স্কুলে গেল—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা আসলে কী শিখল।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছর বয়সী বাংলাদেশের প্রায় ৫১ শতাংশ শিশু বয়সোপযোগী লেখা পড়ে তা বুঝতে পারে না। মাধ্যমিক পর্যায়েও দক্ষতার ঘাটতি প্রকট—Grade 8-এর গণিতে grade-level proficiency ২০১৯ সালের ৬৮ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে মাত্র ২৯ শতাংশে নেমে যায়।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু শিক্ষার্থীর মেধার নয়; প্রশ্নটি শিক্ষাব্যবস্থা, কারিকুলাম, শিক্ষকতা-পদ্ধতি, মূল্যায়ন এবং শেখার পরিবেশ—সবকিছুকে নিয়ে।
আমরা প্রায়ই বলি, “শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী নয়।” কিন্তু কখনো কি প্রশ্ন করি—আমরা তাদের কী শিখতে বলছি?
যে শিক্ষার্থীকে আমরা এমন একটি পৃথিবীতে পাঠাতে যাচ্ছি যেখানে ChatGPT কয়েক সেকেন্ডে একটি উত্তর লিখে দিতে পারে, সেখানে শুধু তথ্য মুখস্থ করানোর মূল্য কতটুকু?
যে পৃথিবীতে একটি মেশিন হাজার হাজার হিসাব মুহূর্তে করতে পারে, সেখানে শুধু হিসাব করার দক্ষতা কি যথেষ্ট?
যে পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই, বরং অতিরিক্ত তথ্যের ভিড়—সেখানে শিক্ষার্থীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা কি তথ্য মুখস্থ করা, নাকি কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে সেই তথ্য ব্যবহার করতে হবে—তা বুঝতে পারা?
UNESCO-ও quality learning-এর ক্ষেত্রে শুধু জ্ঞান ধরে রাখাকে যথেষ্ট মনে করে না; বরং cognitive, emotional ও social skills, problem-solving, learner-centred teaching এবং প্রাসঙ্গিক curriculum-এর ওপর গুরুত্ব দেয়।
তাহলে আমাদের প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
আমাদের শিক্ষার্থীরা কি শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, নাকি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?
আমাদের কারিকুলাম যদি দশ বছর আগের পৃথিবীর প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, অথচ আমরা শিক্ষার্থীদের পাঠাচ্ছি আগামী বিশ বছরের পৃথিবীতে—তাহলে আমরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছি না; বরং অতীতের জন্য প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় নম্বরকে শেখার বিকল্প বানিয়ে ফেলি।
একজন শিক্ষার্থী ৮০ নম্বর পেলেই আমরা ধরে নিই সে ভালো শিখেছে। কিন্তু সে যদি নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে না পারে, বাস্তব উদাহরণ দিতে না পারে, নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে না পারে কিংবা একটি সমস্যার সমাধান করতে না পারে—তাহলে সেই ৮০ নম্বরের শিক্ষাগত মূল্য কতটুকু?
এখানেই আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আত্মসমালোচনার জায়গা।
বাংলাদেশের শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং সত্যিকার অর্থে শেখানো—দুটি ভিন্ন অর্জন।
তাই এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার—
আমরা কি সিলেবাস শেষ করছি, নাকি শিক্ষার্থীর শেখা নিশ্চিত করছি?
আমরা কি পাঠদান করছি, নাকি learning তৈরি করছি?
আমরা কি পরীক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি চিন্তাশীল মানুষ তৈরি করছি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
আমরা কি ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করছি, নাকি অতীতের পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থী তৈরি করছি?
শিক্ষাব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, কারিকুলাম প্রণয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে একটি মাত্র প্রশ্ন:
«“এই শিক্ষার্থী আসলে কী শিখল এবং সেই শেখা দিয়ে সে কী করতে পারবে?”»
কারিকুলাম পরিবর্তন মানেই বইয়ের অধ্যায় পরিবর্তন নয়। পরীক্ষার প্রশ্ন পরিবর্তন মানেই শিক্ষা সংস্কার নয়। নতুন বই ছাপা মানেই আধুনিক শিক্ষা নয়।
প্রকৃত পরিবর্তন তখনই হবে, যখন একজন শিক্ষার্থী মুখস্থ করার চেয়ে বুঝতে, উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন করতে, তথ্যের চেয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করতে এবং পরীক্ষার চেয়ে বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগ করতে বেশি সক্ষম হবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো শিক্ষক নেই—এটি নয়। বই নেই—এটিও নয়। শিক্ষার্থীও নেই—এটিও নয়।
আমাদের সংকট হলো—শিক্ষার সাফল্যকে আমরা এখনও অনেকাংশে “কতটুকু পড়ানো হলো” দিয়ে মাপি; অথচ মাপা উচিত “কতটুকু শেখা হলো” দিয়ে।
দশ বছর আগের পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী এক নয়। আগামী দশ বছরের পৃথিবীও আজকের পৃথিবী থাকবে না।
তাহলে আমাদের শিক্ষা যদি বদলাতে না চায়, পৃথিবী কিন্তু থেমে থাকবে না।
পৃথিবী এগিয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো—আমাদের শিক্ষার্থীরা কি তার সঙ্গে এগোবে, নাকি আমরা তাদের পুরোনো কারিকুলামের ফ্রেমে আটকে রেখে ভবিষ্যতের দৌড়ে শুরু হওয়ার আগেই পিছিয়ে দেব?
এখনই সময়—শিক্ষা নয়, শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকে নয়; আমাদের “শেখানোর দর্শনকেই” নতুন করে ভাবার।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষার্থীরা কত পৃষ্ঠা পড়েছে দিয়ে নয়; বরং তারা কতটা বুঝেছে, কতটা ভেবেছে এবং শেখা জ্ঞান দিয়ে কতটা নতুন কিছু করতে পেরেছে—তা দিয়ে।
৭
৬ মন্তব্য