Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ মে, ২০২৬ ০৬:৩৭ অপরাহ্ণ

যে সত্য জানলে জীবন বদলে যায়

প্রতিদিন ভোরবেলা একটি আওয়াজ ভেসে আসে- “আল্লাহু আকবার”। ঘুমন্ত মানুষ পাশ ফেরে, কেউ উঠে পড়ে, কেউ আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু যে মানুষটি এই দুটি শব্দের অর্থ একবার সত্যিকার অর্থে হৃদয়ে ধারণ করেছে সে আর কখনো আগের মতো থাকতে পারেনি।

"আল্লাহু আকবার" শাব্দিকভাবে অর্থ "আল্লাহ সবচেয়ে বড়।" কিন্তু আরবি ব্যাকরণে "আকবার" কেবল বড়ত্ব নয়, তুলনাতীত শ্রেষ্ঠত্ব বোঝায়। অর্থাৎ যা কিছু তুমি কল্পনা করতে পারো, যা কিছু তোমার মন ধারণ করতে পারে আল্লাহ তার চেয়েও বড়। এই উপলব্ধি যার ভেতরে একবার জ্বলে ওঠে, তার কাছে পার্থিব ক্ষমতা, অর্থ ও মোহ সবই তুচ্ছ হয়ে যায়। 

মহাবিশ্বের দিকে তাকাও একবার, শুধু চিন্তা করো!

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথেই তারার সংখ্যা প্রায় ৪০০ বিলিয়ন। আর এরকম ছায়াপথ মহাবিশ্বে আছে ২ ট্রিলিয়নেরও বেশি। প্রতিটি তারা একটি সূর্যের চেয়ে কোটি গুণ বড়। আমাদের সূর্য প্রতি সেকেন্ডে ৪৫ লক্ষ টন ভর শক্তিতে রূপান্তরিত করছে, এবং ৪.৬ বিলিয়ন বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বলছে। কে এই নিয়ম বানিয়েছেন? কে এই অসীম ভারসাম্য ধরে রেখেছেন?

কুরআন চৌদ্দশত বছর আগেই উত্তর দিয়েছে: "তিনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান, দিনকে রাতের মধ্যে। সূর্য ও চাঁদকে নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রত্যেকটি নির্ধারিত কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।" (সুরা আয-যুমার: ৫) এবং সূরা ফাতিরের ৪১ নং আয়াতে বলা হয়েছে : আল্লাহ যদি আসমান-জমিনকে ধরে না রাখতেন, সেগুলো সরে যেত। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে গ্র্যাভিটেশনাল ব্যালেন্স, ধর্মের ভাষায় এটি আল্লাহর অবিরাম রহমত।

এবার নিজের দিকে তাকাও! 

তোমার বুকে যে হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছে, সে প্রতিদিন একলক্ষ বার স্পন্দিত হয় কোনো বিরতি নেই, কোনো সুইচ নেই, তুমি ঘুমালেও চলে। তোমার মস্তিষ্কে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন প্রতি মুহূর্তে তথ্য আদান-প্রদান করছে পৃথিবীর সব কম্পিউটার একত্রেও এর সমতুল্য নয়। কিন্তু এই মহাজটিল দেহযন্ত্রেও একটি রহস্য রয়ে গেছে যা বিজ্ঞান আজও সমাধান করতে পারেনি- চেতনা কোথা থেকে আসে? "আমি আছি" এই অনুভূতি কোথা থেকে?

কুরআন সেই উত্তর দিয়েছে চৌদ্দ শতাব্দী আগেই: "তারপর তাকে সুঠাম করলাম এবং তার মধ্যে আমার রুহ থেকে ফুঁকে দিলাম।" (সুরা আস-সাজদাহ: ৯) আর সুরা আল-ইসরার ৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে- রুহ আল্লাহর একটি আদেশমাত্র, মানবীয় জ্ঞানের সীমা সেখানে শেষ।

তবু তিনি দূরে নন!

এত বিশাল এই সত্তা কোটি কোটি ছায়াপথের স্রষ্টা তবুও বলছেন: "আমি তার গলার শিরার চেয়েও কাছে।" (সুরা কাফ: ১৬) হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন: "আমি আমার বান্দার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে।" (সহিহ বুখারি: ৭৪০৫) এই মুহূর্তে তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের খবর তিনি রাখছেন। তোমার না-বলা কথাটিও তিনি জানেন।

এখানেই ইসলামের অনন্যতা। অন্য দর্শনে ঈশ্বর হয় অনেক দূরের কোনো শক্তি, নয়তো সর্বত্র মিশে যাওয়া কোনো নিরাকার ধারণা। কিন্তু ইসলামের আল্লাহ তিনি একই সাথে মহাবিশ্বের অসীম মালিক এবং তোমার সবচেয়ে কাছের সত্তা।

তাহলে "আল্লাহু আকবার" শুধু কি একটি বাক্য?

না। এটি একটি বিপ্লব। যে মানুষ সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করে আল্লাহ সবার চেয়ে বড় তার কাছে ক্ষমতাধর মানুষ ছোট হয়ে যায়, সম্পদের লোভ তুচ্ছ হয়, মৃত্যুর ভয় পরিণত হয় প্রভুর সাথে মিলনের আকাঙ্ক্ষায়। আজানে প্রতিদিন পাঁচবার এই ডাক দেওয়া হয় এটি আসলে মানবজাতিকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া: যা কিছু তোমাকে আটকে রেখেছে, সব কিছু তাঁর চেয়ে ছোট, সুতরাং তুমি তাঁর দিকে ফিরে এসো।

কুরআন বলছে: "যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান-জমিনের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে তারাই হলো বিবেকবান।" (সুরা আল-ইমরান, আয়াত নং ১৯১)

চিন্তাশীল মানুষের জন্য প্রশ্ন একটাই: এত বড় এক সত্তা যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমার রুহ দিয়েছেন, তোমার হৃদয় চালাচ্ছেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণু নিয়ন্ত্রণ করছেন—তাঁকে তুমি কতটুকু চেনো?

সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম।

এই তাসবিহ একবার পড়লে মিজানের পাল্লা ভারী হয়ে যায়। হে মহান আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আপনার মহাবিশ্ব, মহাসৃষ্টি জগৎ জানা, বুঝা ও অনুভব করা এবং সে অনুযায়ী সৎ কাজ করার তৌফিক দান করুন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ


মন্তব্য করুন

ব্লগ