Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ মে, ২০২৬ ০১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষকের অবসর বয়স পুনর্বিবেচনা সময়ের দাবি

শিক্ষকের অবসর বয়স পুনর্বিবেচনা সময়ের দাবি

তবে অবসর বয়স বাড়ানোর বিরোধিতায় যে আশঙ্কাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ সংকুচিত হবে। এই উদ্বেগ সম্পূর্ণ অমূলক নয়, কিন্তু এর সমাধান অবসর বয়স কমিয়ে রাখা নয়; বরং একটি ধাপে ধাপে অবসর ব্যবস্থা চালু করা। এতে একজন শিক্ষক পূর্ণকালীন দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে আংশিক সময় কাজ করতে পারেন, এবং একই সঙ্গে নতুন শিক্ষক নিয়োগও চলমান থাকে। ফলে অভিজ্ঞতা ও নবীনতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হয়। ৫৯ থেকে ৬০ বছরে বাধ্যতামূলক অবসরএই একমাত্রিক নীতি বাস্তবতা, আয়ু বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজের চাহিদার সঙ্গে স্পষ্টভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

#মতামতবাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি নীরব অথচ গভীর সংকট হলো শিক্ষকদের অবসর বয়স নির্ধারণে সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। যখন বিশ্বজুড়ে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত প্রজ্ঞাকে সর্বোচ্চ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে, তখন বাংলাদেশ এখনও ৫৯ থেকে ৬০ বছর বয়সে শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে এক বিপুল মানবসম্পদকে কার্যত ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই সীমা ৬৫ থেকে ৭০। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি শিক্ষা মান, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং প্রজন্মান্তরের জ্ঞান হস্তান্তরের ওপর সরাসরি আঘাত। প্রশ্নটি তাই সরল নয়। এটি কি দক্ষ মানবসম্পদের অকাল অবসান, নাকি একটি ভারসাম্যহীন নীতির প্রতিফলন, যা একই সঙ্গে অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করে এবং শিক্ষার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়?প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সময়ের সঙ্গে বৃদ্ধি পায়, যা অন্য অনেক পেশার তুলনায় ব্যতিক্রম। একজন শিক্ষক ৩০ থেকে ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা অর্জনের পরই তার শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষণ কৌশল, এবং শিক্ষার্থীদের মানসিকতা বোঝার ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এই পর্যায়ে এসে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো মানে রাষ্ট্র নিজেই তার সর্বোচ্চ দক্ষ মানবসম্পদকে অব্যবহৃত করে ফেলছে। এটি নিছক অবসর নয়, এটি এক ধরনের ইনসটিটিউশনাল নলেজ লস, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

দ্বিতীয়ত, গড় আয়ু বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় বর্তমান অবসর নীতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু ইতোমধ্যে ৭০ বছরের ওপরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ একজন শিক্ষক ৬০ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার পরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর কর্মক্ষম থাকেন। এই সময়টিকে রাষ্ট্র যদি উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগাতে না পারে, তবে তা অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় ক্ষেত্রেই অপচয়ের শামিল। উন্নত বিশ্বে এই কারণেই অবসর বয়স ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে, যাতে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্থনীতির ভেতরেই থাকে।

তৃতীয়ত, অবসর বয়স কম রাখার একটি প্রচলিত যুক্তি হলো এতে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু এই যুক্তি আংশিক সত্য এবং অনেকাংশে বিভ্রান্তিকর। কারণ শিক্ষার মান যদি দুর্বল হয়, তবে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ শিক্ষকরা যথাযথ গাইডেন্স ও মেন্টরশিপ থেকে বঞ্চিত হন। ফলে একটি দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি মানহানি ঘটে। উন্নত দেশগুলো এই সমস্যার সমাধান করেছে মেন্টর টিচার সিস্টেম চালু করে, যেখানে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অবসরের পরও প্রশিক্ষক ও পরামর্শক হিসেবে যুক্ত থাকেন।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অবসর বয়স পুনর্বিবেচনা জরুরি। কম বয়সে অবসর মানে দীর্ঘ সময় ধরে পেনশন প্রদান, যা রাষ্ট্রের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, অবসর বয়স বাড়ালে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং পেনশন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমে।

তবে অবসর বয়স বাড়ানোর বিরোধিতায় যে আশঙ্কাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ সংকুচিত হবে। এই উদ্বেগ সম্পূর্ণ অমূলক নয়, কিন্তু এর সমাধান অবসর বয়স কমিয়ে রাখা নয়; বরং একটি ধাপে ধাপে অবসর ব্যবস্থা চালু করা। এতে একজন শিক্ষক পূর্ণকালীন দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে আংশিক সময় কাজ করতে পারেন, এবং একই সঙ্গে নতুন শিক্ষক নিয়োগও চলমান থাকে। ফলে অভিজ্ঞতা ও নবীনতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হয়। ৫৯ থেকে ৬০ বছরে বাধ্যতামূলক অবসরএই একমাত্রিক নীতি বাস্তবতা, আয়ু বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজের চাহিদার সঙ্গে স্পষ্টভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে রাষ্ট্র একদিকে যেমন দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদ হারাচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।শিক্ষকদের অবসর বয়স নির্ধারণ এখন আর বিলম্ব সহ্য করার মতো কোনো প্রান্তিক নীতিগত প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্রীয় ইস্যু। ৬০ বছরে বাধ্যতামূলক অবসর এই একমাত্রিক নীতি বাস্তবতা, আয়ু বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজের চাহিদার সঙ্গে স্পষ্টভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে রাষ্ট্র একদিকে যেমন দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদ হারাচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অতএব, সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট হওয়া উচিত শিক্ষকদের অবসর বয়স ধাপে ধাপে ৬৫ বছরে উন্নীত করতে হবে এবং এর সঙ্গে পারফরম্যান্সভিত্তিক এক্সটেনশন, মেন্টরশিপ ব্যবস্থা ও আংশিক অবসর চালু করতে হবে। এটি কোনো আপস নয়, বরং একটি কৌশলগত বিনিয়োগ, যা অভিজ্ঞতা ও নবীনতার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করবে।

নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন দুইটি পথ খোলা একটি হলো পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে ধরে দক্ষতা অপচয়ের চক্র অব্যাহত রাখা; অন্যটি হলো বাস্তবতা-নির্ভর সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, টেকসই এবং মানসম্মত করে তোলা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে, দ্বিতীয় পথটিই এখন একমাত্র যুক্তিযুক্ত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ

#মতামত

মন্তব্য করুন

ব্লগ