সিনিয়র শিক্ষক
১৯ মে, ২০২৬ ০৮:৪৪ অপরাহ্ণ
রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার ‘বট বাহিনী’
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সেলিব্রেটিদের মুখে বারবার শোনা যাচ্ছে একটি শব্দ—‘বট বাহিনী’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, সমন্বিত আক্রমণ চালানো কিংবা নির্দিষ্ট মতামতকে প্রভাবিত করার অভিযোগে এই বট বাহিনী নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। তবে প্রযুক্তিগতভাবে ‘বট’ আসলে কী এবং কীভাবে এটি কাজ করে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বট মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশনভিত্তিক প্রযুক্তি, যা মানুষের হয়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে। এ বিষয়ে ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট সাব্বির আহমেদ বলেন, বট বলতে আমরা অটোমেশন প্রসেস বা রোবোটিক অ্যাপ্রোচ বুঝি। যেমন পেজের ফলোয়ার বাড়ানো, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেসেজ পাঠানো বা কানেকশন রিকোয়েস্ট পাঠানোর মতো কাজগুলো বটের মাধ্যমে করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেটে বহু বছর ধরেই বটের ব্যবহার থাকলেও বাংলাদেশে এটি বেশি পরিচিতি পেয়েছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিতভাবে মন্তব্য, লাইক বা প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে।
ডিজিটাল রাইটস সংগঠনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, একজন ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে, যেগুলো দিয়ে একই ধরনের মন্তব্য করা হয়। আবার কিছু রাজনৈতিকভাবে মোটিভেটেড ব্যক্তি বটের মতো আচরণ করেন। কোনো গ্রুপ থেকে নির্দেশনা আসার পর শত শত মানুষ একযোগে কোনো পোস্টে ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সব অ্যাকাউন্ট ভুয়া না হলেও তারা সমন্বিতভাবে মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির কারণে বট পরিচালনা আরো সহজ হয়ে গেছে। আগে নির্দিষ্ট সময়ে পরপর একই ধরনের মন্তব্য বা মেসেজ পাঠানো হলেও এখন এআই ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় মন্তব্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যেন প্ল্যাটফর্মগুলো সহজে সেগুলো শনাক্ত করতে না পারে।
সাব্বির আহমেদ বলেন, এআই আসার পর বটের কার্যক্রম আরো উন্নত হয়েছে। এখন বিভিন্ন ধরনের কমেন্ট সাজিয়ে রাখা যায়, যেন ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম সেটিকে স্বাভাবিক ব্যবহারকারীর আচরণ মনে করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বটের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট মত বা কনটেন্টকে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে উপরে তুলে ধরা অথবা নিচে নামিয়ে দেওয়া। এটি ব্যবসায়িক প্রচারণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রচার—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ইন্টারনেটের মোট ট্র্যাফিকের ৫৩ শতাংশই ছিল বটনির্ভর, যার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল ক্ষতিকর বট।
বাংলাদেশেও ব্যবসায়িক প্রচারণার পাশাপাশি রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানো এবং সমন্বিত অনলাইন প্রচারণায় বট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মার্কেটিংয়ের আড়ালে অর্থের বিনিময়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ সাব্বির আহমেদ বলেন, এসএম প্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের নামে অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাইরে থেকে ব্যবসায়িক মনে হলেও ভেতরে অসাধু উদ্দেশ্যে এসব সেবা ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে ডিসমিসল্যাবের এক গবেষণায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত বট নেটওয়ার্কের সক্রিয়তার তথ্য উঠে আসে। একই বছর সমন্বিত ভুয়া আচরণের অভিযোগে দল-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ অপসারণ করে মেটা।
এ ছাড়া আরেক গবেষণায় দাবি করা হয়, জুলাই আন্দোলন ঘিরে অনলাইন বয়ান নিয়ন্ত্রণ ও প্রচারণার জন্য ২২ শতাংশের বেশি মন্তব্য বটের মাধ্যমে করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বট বাহিনীর মাধ্যমে হয়রানি বা সমন্বিত আক্রমণ যদি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এটাকে ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার’ বলা হয়। যদি এটি হয়রানির পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করতে পারে। তবে কেস বাই কেস মূল্যায়নের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যেন বৈধ মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করার পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরি।
সূত্র : বিবিসি
৫
৫ মন্তব্য