সিনিয়র শিক্ষক
১৯ মে, ২০২৬ ০৮:০৯ অপরাহ্ণ
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে নতুন রহস্য
নাসার ম্যাভেন মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহে এমন একটি নতুন ঘটনা শনাক্ত করেছে, যা আগে কখনো সরাসরি দেখা যায়নি। এই ঘটনার নাম ‘জওয়ান-উলফ প্রভাব’।
এই প্রভাব পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের এলাকায় আগে থেকেই পরিচিত ছিল। তবে কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এটি এবারই প্রথম দেখা গেল।
এই গবেষণার ফল প্রকাশ হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচার কমিউনিকেশন্স’-এ। বিজ্ঞানীরা জানান, এই আবিষ্কারের পেছনে বড় একটি সৌর ঝড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মঙ্গলে শক্তিশালী সৌর ঝড় আঘাত হানে। গবেষকদের ধারণা, সাধারণ সময়েও হয়তো এই প্রভাব ঘটে, কিন্তু তা এত দুর্বল থাকে যে যন্ত্রগুলো ধরতে পারে না। সৌর ঝড়ের কারণে সেটি আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং স্পষ্টভাবে শনাক্ত হয় এবং সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীতে এই প্রভাব সৌর বায়ুকে ঠেকাতে সাহায্য করে এবং আমাদের গ্রহকে সুরক্ষিত রাখে। সৌর বায়ু হলো সূর্য থেকে অবিরাম নির্গত হওয়া চার্জযুক্ত কণা বা প্লাজমার (প্রধানত ইলেকট্রন এবং প্রোটন) একটি দ্রুতগামী স্রোত। এই কণাগুলো সূর্য থেকে ঘণ্টায় প্রায় ১০-২০ লাখ মাইল (সেকেন্ডে ৪০০-৮০০ কিলোমিটার) বেগে সমগ্র সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মঙ্গল গ্রহে ‘জওয়ান-উলফ প্রভাব’-এর আচরণ ভিন্ন। সেখানে এটি বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশকে চেপে ধরে এবং মহাকাশের আবহাওয়ার প্রভাবকে পরিবর্তন করে দেয়।
এই গবেষণার প্রধান লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ফোওলার নাসাকে জানান, তথ্য বিশ্লেষণের সময় হঠাৎ অদ্ভুত কিছু ‘ওঠানামা’ তার চোখে পড়ে। শুরুতে তিনি ভাবতেই পারেননি এটি ‘জওয়ান-উলফ প্রভাব’ হতে পারে। কারণ আগে কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনা দেখা যায়নি।
প্রথমে গবেষকদল ম্যাভেনের তথ্যের মধ্যে চৌম্বক ক্ষেত্রের কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখতে পায়। এরপর তারা আয়নমণ্ডলের কণাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে। সব সম্ভাবনা যাচাই করার পর তারা নিশ্চিত হন, এই পরিবর্তনের কারণই ছিল জওয়ান-উলফ প্রভাব।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই গবেষণা মঙ্গলের জলবায়ু ও বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে। পাশাপাশি শুক্র গ্রহ বা শনি গ্রহের উপগ্রহ টাইটানের মতো অন্য কোথাও একই ধরনের প্রভাব আছে কি না, সেটিও ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
এই প্রভাব প্রথম শনাক্ত করা হয় ১৯৭৬ সালে। এতে দেখা যায়, চার্জযুক্ত কণা চৌম্বক ক্ষেত্রের নির্দিষ্ট রেখা বরাবর চাপ খেয়ে একসঙ্গে জমা হয়। এই রেখাগুলোকে বলা হয় ফ্লাক্স টিউব।
পৃথিবীতে এই প্রক্রিয়া সৌর বায়ুকে আমাদের চৌম্বক ঢালের চারপাশ দিয়ে ঘুরিয়ে দেয়। ফলে গ্রহটি অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকে। বিজ্ঞানীরা একে অনেকটা টিউব থেকে টুথপেস্ট বের হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
কিন্তু মঙ্গলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। কারণ মঙ্গলের কোনো শক্তিশালী বৈশ্বিক চৌম্বক ক্ষেত্র নেই। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সেখানে এই প্রভাব দেখা যাবে না।
তবু নাসার ম্যাভেন মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের আয়নমণ্ডলে অস্বাভাবিক ওঠানামা শনাক্ত করে। আয়নমণ্ডল হলো মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের বিদ্যুৎযুক্ত অংশ, যা গ্রহটির ওপরের দিকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
ম্যাভেন (মারস অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ভোলাটাইল ইভালুশন) মিশনের কাজ হলো মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল, আয়নমণ্ডল এবং সূর্য ও সৌর বায়ুর সঙ্গে গ্রহটির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরের সৌর ঝড়ের সময় ম্যাভেন মহাকাশযানটি দেখতে পায়, মঙ্গলের আয়নমণ্ডলের চার্জযুক্ত কণাগুলো প্রথমে চাপ খায়, এরপর সেগুলো আবার পুরো গ্রহজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রভাব শুধু মহাকাশের আশপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বায়ুমণ্ডলের আরো গভীর অংশেও এর প্রভাব পাওয়া গেছে।
নতুন এই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে ধরা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, মহাকাশের আবহাওয়ার ঘটনা কীভাবে গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ভেতরেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
গবেষক ক্রিস্টোফার ফোওলার বলেন, কেউ ভাবেনি এই প্রভাব বায়ুমণ্ডলের ভেতরেও ঘটতে পারে। তাই এই আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞানের নতুন দিক খুলে দিয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
নাসার আরেক গবেষক এবং ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের বিজ্ঞানী শ্যানন কারি বলেন, মহাকাশের আবহাওয়া মঙ্গলের সঙ্গে কিভাবে কাজ করে, তা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাভেন মিশন নিয়মিত নতুন তথ্য দিচ্ছে এবং সূর্য ও মঙ্গলের সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন ধারণাও তৈরি করছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মঙ্গলের জলবায়ু ও বায়ুমণ্ডল কিভাবে কাজ করে, তা আরো ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
ম্যাভেন মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৩ সালের নভেম্বরে। এটি ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছায়। এই মিশনের অন্যতম লক্ষ্য হলো মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল কিভাবে ধীরে ধীরে মহাকাশে হারিয়ে যাচ্ছে, তা বোঝা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল হারানোর কারণ বুঝতে পারলে গ্রহটির অতীত জলবায়ু, সেখানে একসময় পানি ছিল কি না এবং প্রাণের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর আরো পরিষ্কার হবে। তবে সম্প্রতি ম্যাভেন মিশন নতুন সমস্যার মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর মঙ্গলের কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানটির সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসা একটি বিশেষ পর্যালোচনা বোর্ড গঠন করে। তারা এখন খতিয়ে দেখছে, মহাকাশযানটিকে আবার সচল করা সম্ভব কি না।
২
৪ মন্তব্য