সহকারী অধ্যাপক
১৯ মে, ২০২৬ ০৮:০০ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ইসলামী বর্ষপঞ্জির শেষ মাস জিলহজ এমন এক সময়, যখন ইবাদত, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ একসঙ্গে মিলিত হয়। বিশেষত এই মাসের প্রথম দশ দিনকে কুরআন ও হাদিসে অনন্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যা মুসলিম জীবনে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘শপথ সেই দশ রাতের’। (সুরা আল-ফজর ২)
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে জিলহজের প্রথম দশ দিনই উদ্দেশ্য। ইবন কাসির রহ. তার তাফসিরে উল্লেখ করেন, এই দিনগুলোর মর্যাদা এতই উচ্চ যে আল্লাহ তায়ালা নিজেই এর শপথ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাদিসে এই সময়ের আমলের গুরুত্ব আরও সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এমন কোনো দিন নেই, যেগুলোতে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের চেয়ে অধিক প্রিয়। (সহিহ বুখারি)
ইমাম নববী রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এই দিনগুলোতে ফরজ, নফল, জিকির, সাদাকাহ সব ধরনের ইবাদত একত্রে করার সুযোগ থাকে, যা বছরের অন্য কোনো সময়ে এতটা সমন্বিতভাবে পাওয়া যায় না।
এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রোজা রাখা। বিশেষ করে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবে। (সহিহ মুসলিম)
এছাড়া তাকবির, তাহমিদ, তাসবিহ ও অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করারও বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম রা. এই দিনগুলোতে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করতেন, যা সমাজজুড়ে এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করত।
জিলহজের প্রথম দশ দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা অনেকের অজানা থেকে যায়, তা হলো কুরবানির নিয়তকারী ব্যক্তির জন্য নখ, চুল ও শরীরের অতিরিক্ত লোম না কাটা।
এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, যখন তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করে এবং জিলহজের চাঁদ দেখা যায়, তখন সে যেন তার চুল ও নখ থেকে কিছু না কাটে, যতক্ষণ না কুরবানি সম্পন্ন করে। (সহিহ মুসলিম)
এই বিধান সম্পর্কে ফিকহবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল-এর মতে, এটি পালন করা অধিক গুরুত্বের দাবিদার এবং তা পরিত্যাগ করা অনুচিত।
অন্যদিকে ইমাম শাফেয়ী ও অন্যান্য আলেমের মতে, এটি সুন্নাহ বা মুস্তাহাব অর্থাৎ পালন করলে সওয়াব রয়েছে, না করলে গুনাহ নেই। তবে সকলেই একমত এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা কুরবানির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিশেষ আমল।
এই বিধানের পেছনে একটি আধ্যাত্মিক দিকও রয়েছে। অনেক আলেমের মতে, এটি হজে থাকা হাজীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতীকী সাদৃশ্য সৃষ্টি করে যেখানে তারা ইহরামের অবস্থায় কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. উল্লেখ করেন, ইসলামের অনেক আমলেই এই ধরনের আধ্যাত্মিক মিল ও সংযোগ লক্ষ্য করা যায়, যা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও অনুভূতির সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।
সমকালীন বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেকেই কুরবানিকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে দেখেন, কিন্তু তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সুন্নাহ ও প্রস্তুতিগুলোকে গুরুত্ব দেন না। অথচ এই সময়ের প্রতিটি আমল ছোট বা বড় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জিলহজের এই দিনগুলো তাই কেবল পশু কুরবানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আত্মসংযম, ইবাদতে মনোনিবেশ এবং সুন্নাহর অনুসরণের একটি পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন।
একজন সচেতন মুসলিমের জন্য এটি নিজের আমল, অভ্যাস ও আধ্যাত্মিক অবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
৫
৫ মন্তব্য