Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ মে, ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ণ

শিক্ষাঙ্গনে পরিমিত রাজনীতি: জ্ঞান ও নৈতিকতা পুনরুদ্ধারের মহাসড়ক

শিক্ষাঙ্গনে পরিমিত রাজনীতি: জ্ঞান ও নৈতিকতা পুনরুদ্ধারের মহাসড়ক
(মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগী কর্মপরিকল্পনা)

মুফিদুল আলম


সিনিয়র শিক্ষক, নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, রামু, কক্সবাজার।

ভূমিকা: বিদ্যায়তন নাকি বিভাজনের ক্ষেত্র?
প্রাচীন তক্ষশীলা ও নালন্দা ছিল জ্ঞানের আলোকিত তীর্থভূমি। সেখানে মতের ভিন্নতা ছিল, ছিল যুক্তিনির্ভর তর্ক-বিতর্ক; কিন্তু বিদ্বেষ ও বিভক্তির কোনো স্থান ছিল না। জ্ঞানচর্চা সেখানে মানুষকে মুক্তচিন্তা, মানবিকতা ও সভ্যতার পথে পরিচালিত করত।
আজ আমাদের শিক্ষাঙ্গন সেই গৌরবময় ঐতিহ্য হারিয়েছে। সুস্থ সংস্কৃতির স্থান দখল করেছে গোষ্ঠীগত রাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই আর প্রশাসনিক অস্থিরতা। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় আফসোস করে বলতে হয়, “পৃথিবীতে এত নষ্ট হত না ভোরের পাখি”। আমাদের শিক্ষার্থীরাই সেই ভোরের পাখি। তাদের স্বপ্ন, মেধা ও মনন যদি দলীয় লেজুড়বৃত্তির চাপে পিষ্ট হয়, তবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাবে।
তাই আজ সময় এসেছে স্পষ্ট উচ্চারণের: শিক্ষাঙ্গনকে ফিরিয়ে আনতে হবে একটি সুস্থ, মুক্ত ও নৈতিক পরিমণ্ডলে—যেখানে জ্ঞানচর্চা হবে অবাধ, মতপ্রকাশ হবে দায়িত্বশীল এবং নেতৃত্ব বিকাশ হবে অহিংস ও প্রাতিষ্ঠানিক। এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রধান তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড় করাতে হবে।

প্রথম স্তম্ভ: সহিংস ও দলকেন্দ্রিক রাজনীতির কঠোর সীমিতকরণ
(সেশনজট নিরসন ও নির্ধারিত সময়ে ছাত্রজীবন সমাপ্তির হাতিয়ার)শিক্ষাঙ্গনে দলীয় সংঘাত ও সেশনজট দীর্ঘদিনের এক অভিশাপ। শিক্ষার মূল লক্ষ্য যখন মেধার বিকাশ ছেড়ে ক্ষমতার মহড়ায় রূপ নেয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। আইরিশ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের (W. B. Yeats) সেই বিখ্যাত অমিলন উক্তিটিই যেন বারবার সত্য হয়ে ওঠে—“Things fall apart; the centre cannot hold” (সবকিছু ভেঙে পড়ে, কেন্দ্র আর ধরে রাখতে পারে না)।

প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা:
'শিক্ষার পরিবেশ সুরক্ষা ফোরাম' গঠন: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ফোরাম তৈরি করতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো প্রকার ভয় বা সংকোচ ছাড়া তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিযোগ বা হয়রানির কথা জানাতে পারে।
ছাত্র সংসদকে জবাবদিহির আওতায় আনা: নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রধান এজেন্ডা হতে হবে—‘নির্ধারিত সময়ে সেশনজটমুক্ত ছাত্রজীবন সমাপ্তি’।
স্বচ্ছ একাডেমিক মনিটরিং: ভর্তি, পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশের মতো সকল একাডেমিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও শতভাগ স্বচ্ছ রাখতে হবে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ: শিক্ষকদের পেশাগত নিরপেক্ষতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা
শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তিনি মূলত একটি প্রজন্মের মূল্যবোধের কারিগর। কিন্তু দলীয় পরিচয় যখন শিক্ষকের পেশাগত ও নৈতিক পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়, তখন শিক্ষার্থীরাও আদর্শচ্যুত ও বিভক্ত হয়ে পড়ে। দার্শনিক জঁ-জাক রুশোর (Jean-Jacques Rousseau) মতে, আদর্শ নাগরিক গড়তে শিক্ষককে হতে হয় সমাজ ও নৈতিকতার এক নিরপেক্ষ প্রতিবিম্ব।
(নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চাবিকাঠি)প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা:
যৌথ নিরাপত্তা ও নৈতিক তদারকি কমিটি: ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা রোধে শিক্ষক এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠন করা।
শৃঙ্খলা রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে অবারিত ও সুরক্ষিত; কিন্তু অস্ত্রধারণ, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, র‍্যাগিং এবং ভীতিপ্রদর্শনের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে 'শূন্য সহনশীলতা' নীতি গ্রহণ করতে হবে।
মনন-সুরক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য সেল: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা, যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটে অভিভাবকের পরম মমতায় পাশে দাঁড়াবেন।

তৃতীয় স্তম্ভ: দলীয় দাসত্ব নয়, গঠনমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিচর্চা
দার্শনিক এরিস্টটল মানুষকে ‘রাজনৈতিক প্রাণী’ (Political Animal) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই নাগরিক সচেতনতা, দেশপ্রেম ও নেতৃত্ব চর্চাকে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তবে সেই চর্চা অন্ধ দলদাসত্ব নয়, হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেতনায় আমাদের সংগ্রাম হোক অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে।
(উচ্চশিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে দক্ষতা ও গবেষণার ক্ষেত্রে রূপান্তর)প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা:
সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: বিতর্ক ক্লাব, মডেল ইউনাইটেড নেশনস (MUN), বিজ্ঞান ক্লাব, সাহিত্য সংসদ ও নীতি গবেষণা সেমিনারকে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এর জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া।
রিসার্থ মেন্টরিং ও এথিক্যাল লিডারশিপ: শিক্ষক প্রশিক্ষণে ‘রিসার্চ মেন্টরিং’ এবং ‘নৈতিক নেতৃত্ব’ বিষয় দুটিকে বাধ্যতামূলক করা, যাতে শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় শিক্ষার্থীদের পথ দেখাতে পারেন।
শিক্ষাঙ্গনকে ‘লিভিং ল্যাব’-এ রূপান্তর: জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় পরিবেশ বিপর্যয় (যেমন: অবাধে পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট), প্লাস্টিক দূষণ কিংবা পর্যটন সম্ভাবনার মতো বাস্তব সমস্যাগুলোকে শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ের গবেষণার বিষয়বস্তু করা। এতে তত্ত্বীয় জ্ঞানের সাথে বাস্তব কর্মসংস্থানের একটি সুদৃঢ় সংযোগ তৈরি হবে।

উপসংহার: জ্ঞানের আলোকেই হোক শিক্ষাঙ্গনের অনন্য পরিচয়
শিক্ষা কেবল একটি ভালো চাকরির সনদ অর্জনের হাতিয়ার নয়, এটি মানুষ গড়ার এক নিরবচ্ছিন্ন জীবন্ত প্রক্রিয়া। শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey) যথার্থই বলেছিলেন, “Education is not preparation for life; education is life itself” (শিক্ষা জীবনের প্রস্তুতি নয়, শিক্ষা নিজেই একটি জীবন)।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন—একটি সেশনজটমুক্ত, নিরাপদ, আধুনিক, প্রযুক্তিগত ও গবেষণানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা—যদি আমরা সত্যি বাস্তবায়ন করতে চাই, তবে আজই শিক্ষাঙ্গন থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বিষদাঁত ভাঙতে হবে। ক্যাম্পাস হোক জ্ঞানের অভয়ারণ্য; যেখানে বই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি, যুক্তি হবে সবচেয়ে ধারালো ভাষা এবং মানবিকতাই হবে একমাত্র পরিচয়।
আমাদের আগামী প্রজন্ম যেন বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলতে পারে—আমরা এমন এক শিক্ষাঙ্গন পেয়েছিলাম, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মেধার মূল্য বেশি ছিল, এবং বিভাজনের চেয়ে সহমর্মিতা ছিল অনেক বড়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ