Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ মে, ২০২৬ ০২:৩৯ অপরাহ্ণ

হামের ঝুকিতে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট

                  হামের ঝুকিতে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট 

                                  

বর্তমান অবস্থাঃ

বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে এ বছর হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৬৭ জনে এবং সাত হাজারেরও বেশি মানুষের দেহে ল্যাবরেটরিতে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। 

মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৬৭৬টি নিশ্চিত সংক্রমণ এবং ৩৮ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।  (UNICEF)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে "উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ" বলে মূল্যায়ন করেছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।  

বিশ্বে এক বছরে ৫০ হাজারের বেশি হাম রোগী পাওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ এখন পঞ্চম দেশ। এই তালিকায় আগে ছিল ভারত, ইউক্রেন, মাদাগাস্কার ও কঙ্গো।  

হাম কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

হাম হলো শ্বাসযন্ত্রের একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাল সংক্রমণ, যা রুবেওলা ভাইরাসের কারণে হয়।  (Apollo Hospitals) এটি বায়ুবাহিত রোগ — আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নিলে, কাশি বা হাঁচি দিলে সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।  (UNICEF)

ফুসকুড়ি প্রকাশের চার দিন আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি হামের জীবাণু নিজের অজান্তে ছড়াতে থাকে, এবং লক্ষণ প্রকাশের পরেও আরও চার দিন সে ছোঁয়াচে থাকে।  (Wikipedia)

হামের লক্ষণঃ

হামের লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং শুরুতে সাধারণ জ্বরের মতো মনে হতে পারে। প্রথমে মুখে বা কানের পেছনে দানা দেখা যায়, পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।  (Drsalahuddin)

ফুসকুড়ি মুখ ও ঘাড় থেকে শুরু হয়ে নিচের দিকে বুক, পেট, হাত ও পায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ৫-৬ দিন স্থায়ী হয়।  (Banglakathan)

জটিল ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস এবং তীব্র ডায়রিয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি অন্ধত্বের কারণও হতে পারে।  

হামের কারণ ও ঝুঁকি

হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনেক শিশু এখনো "এমআর" টিকা পায়নি বা টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এর ফলে এসব টিকাবঞ্চিত শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি।  (Prothomalo)

ভিটামিন 'এ'-র অভাব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে এবং হামের লক্ষণগুলোকে আরও গুরুতর করে তোলে।  (Medicover Hospitals)

প্রতিকারঃ

হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। বেশিরভাগ রোগী ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সুস্থ হন। চিকিৎসার লক্ষ্য হলো উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রচুর পানি ও তরল খাবার এবং ভিটামিন A সাপ্লিমেন্ট দেওয়া জরুরি। WHO-এর পরামর্শ অনুযায়ী সকল হাম রোগীকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ২টি ডোজ ভিটামিন A দিতে হবে — এটি মৃত্যুহার ৫০% পর্যন্ত কমাতে পারে। 

সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করার জন্য সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামের টিকা নেওয়া উচিত। বিকল্পভাবে, রোগের তীব্রতা কমাতে সংস্পর্শে আসার ছয় দিনের মধ্যে ইমিউন গ্লোবুলিন দেওয়া যেতে পারে।  (Apollo Hospitals)

করণীয় — অভিভাবকদের জন্য

যদি শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, খিঁচুনি হয় বা খুব দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে — এসব লক্ষণ জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। শিশুকে বিশ্রামে রাখুন এবং পর্যাপ্ত পানি দিন। সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি।  

হামের টিকা একটি সম্মিলিত হাম-মাম্পস-রুবেলা (MMR) ভ্যাকসিন হিসেবে দেওয়া হয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেন যে শিশুরা ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে এবং পুনরায় ৪ থেকে ৬ বছর বয়সের মধ্যে স্কুল শুরু করার আগে এই টিকা নেবে।  (Medicover Hospitals)

UNICEF সরকারের সাথে মিলে WHO ও Gavi-র সহায়তায় ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে জরুরি টিকাদান অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানে প্রথমে ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং পরবর্তীতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ২ কোটি শিশুকে সারা দেশে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।  

সর্বশেষ কথা:

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে টিকা নেওয়া এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ