Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ মে, ২০২৬ ১২:০৪ অপরাহ্ণ

পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা ও বাংলার শ্মশানযাত্রা: একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি

পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা ও বাংলার শ্মশানযাত্রা: একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি

সূচনা:
সম্পদের স্বর্গ বনাম শোষণের শৃঙ্খল
ইতিহাসের পাতায় বাংলা চিরকালই ছিল সুজলা-সুফলা ও ধনধান্যে পুষ্পে ভরা এক প্রাচুর্যের জনপদ। সুদূর রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে পর্যটক ইবনে বতুতা কিংবা বার্নিয়েরের বর্ণনায় এই জনপদকে ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে সেই সগৌরব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়। যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্র, আর সেই ষড়যন্ত্রের হাত ধরেই বাংলার ললাটে সূচিত হয় দুই শতাব্দীর দাসত্ব আর চরম হাহাকার।

বিশ্বাসঘাতকতার জাল: মীর জাফর থেকে উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, রায়দূর্লভ ও ঘসেটি বেগম
যুগ যুগ ধরে 'মীর জাফর' শব্দটি কেবল একটি নাম নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতার কালজয়ী বিশেষণ। পলাশীর যুদ্ধে সিপাহসালার মীর জাফরের নিষ্ক্রিয়তা ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় বিকিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত দলিল। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের জাল এককভাবে মীর জাফর বুনেছিলেন না— তাঁর পাশাপাশি ছিল এক দীর্ঘ লাইন।
ঘসেটি বেগম, আলীবর্দি খানের পুত্রবধূ ও সিরাজের ফুফু, সিংহাসনের লোভে চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন। তিনি সরাসরি ইংরেজদের গুপ্ত সভায় অংশ নিয়ে সিরাজের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁস করেন। জগৎশেঠ ও রায়দূর্লভ— মুর্শিদাবাদের শক্তিশালী ব্যাংকার ও বণিক পরিবার— সিরাজের কঠোর শাসনে নিজেদের স্বার্থ সংকুলাতে না পেরে ইংরেজদের হাতে বিপুল অর্থ ও গোপন সংবাদ পৌঁছে দেন। আর উমিচাঁদ, সেই সুদক্ষ গুপ্তচর ও সুদীর্ঘ প্রতারক, একইসঙ্গে সিরাজ দরবার ও ইংরেজ কাউন্সিলে দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করেন; তিনিই প্রথম নবাবের বিরুদ্ধে নকল চুক্তি ফাঁসের কৌশল রচনা করেন।
এই চার মুখ— ক্ষমতালিপ্সু বেগম, স্বার্থপর ব্যাংকার, নিষ্ক্রীয় বণিক আর দ্বিচারীর গুপ্তচর— একসঙ্গে মীর জাফরের হাতে বিশ্বাসঘাতকতার কলম ধরিয়ে দেয়। ব্যক্তিগত লোভ ও ক্ষমতার লালসা যখন জাতীয় স্বার্থের ওপর স্থান পায়, তখন জাতির কপালে দুর্দশার যে বীজ বপন করা হয়, তার ফল হয় ভয়াবহ। মীর জাফররা বিদেশি শক্তির হাতে নিজেদের চাবি তুলে দিয়ে সাময়িক ক্ষমতা হয়তো পেয়েছিলেন, কিন্তু বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জন্য রেখে গেছেন এক চরম অনিশ্চয়তা ও শোষণের নরককুণ্ড।

লুণ্ঠনের মহোৎসব ও রবার্ট ক্লাইভের সম্পদ পাচার
পলাশী জয়ের পর শুরু হয় বাংলার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম লুণ্ঠন। সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর রবার্ট ক্লাইভ যখন মুর্শিদাবাদের রাজকোষে প্রবেশ করেন, তখন সেখানকার সোনা, রুপা আর মণি-মাণিক্যের ঐশ্বর্য দেখে খোদ দস্যুরাও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। নবাবশাহী লুণ্ঠন করে রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য করে দেওয়া হয়।
বিশ্বাসঘাতকদের পুরস্কারও কম যায়নি। মীর জাফর নবাব হন, জগৎশেঠ ও রায়দূর্লভের পরিবার পায় বিপুল অঙ্কের অর্থ ও বাণিজ্যিক সুবিধা। কিন্তু ইংরেজদের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার কখনোই নির্ভরযোগ্য নয়। ১৭৬৫ সালে দ্বিতীয় বার ক্লাইভ বাংলায় ফিরে এলে জগৎশেঠ ও রায়দূর্লভকে ‘মীর জাফরের হত্যার ষড়যন্ত্র’-এর মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ করে নির্যাতন চালানো হয়। সেই নির্যাতনে জগৎশেঠের ভাই মহারাজ স্বরূপচাঁদ নিহত হন। লর্ড ক্লাইভ ও তার সহযোগীরা ব্যক্তিগত উপঢৌকন আর কোম্পানির পাওনা মেটানোর নামে যে বিপুল সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করেছিলেন, তা ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক লুণ্ঠন। বাংলার এই রক্তক্ষরণই মূলত ব্রিটেনের 'শিল্প বিপ্লব'-এর চাকা সচল করেছিল, আর বিনিময়ে এদেশের মানুষের ভাগ্যে জুটেছিল কেবল হাহাকার।

দুর্ভিক্ষের নেপথ্যে: দ্বৈত শাসন ও অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ
পলাশী-পরবর্তী বাংলা মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে (১৭৫৭-১৭৭০) যে ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়েছিল, তার নাম ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর ইংরেজদের প্রবর্তিত ‘দ্বৈত শাসন’ ছিল মূলত একটি দায়িত্বহীন ক্ষমতার প্রয়োগ। একদিকে মীর জাফর বা তার উত্তরসূরিদের হাতে ছিল নামমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব— যেন ব্যর্থতার ঝুলি ঝোলানো যায়। অন্যদিকে কোম্পানির হাতে ছিল সীমাহীন অর্থ আদায়ের অধিকার।
রাজস্বের এই নির্মম ক্ষুধা মেটাতে কৃষকদের ওপর করের বোঝা এমনভাবে চাপানো হয়েছিল যে, বৃষ্টির অভাবে ফসল না হলেও খাজনার কোনো ক্ষমা ছিল না। বাংলার অর্জিত সম্পদ তখন আর এদেশের বাজারে ঘুরত না, বরং তা বাণিজ্যের ছদ্মবেশে পাচার হয়ে যেত সুদূর লন্ডনে। পলাশীর বিশ্বাসঘাতক চক্র— যে চক্র ঘসেটি বেগমের বিদ্বেষ থেকে জগৎশেঠের ব্যাংকের টাকা পর্যন্ত বিস্তৃত— প্রকৃতপক্ষে এই শোষণতন্ত্রের ভিত গড়ে দিয়েছিল।

সোনার বাংলার শ্মশানে রূপান্তর
প্রকৃতির খরা হয়তো সহনীয় ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ বেনিয়াদের কৃত্রিম সংকট ছিল অসহ্য। চালের একচেটিয়া কারবার, মজুতদারি এবং কৃষকদের জোর করে নীল বা পপি চাষে বাধ্য করার ফলে বাংলার শস্যভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়ে। ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) বাংলার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে লাশের গন্ধে। প্রায় এক কোটি মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে, যা ছিল তৎকালীন জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ।
এই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না। এটি ছিল ১৭৫৭ সালের সেই আম্রকাননের ষড়যন্ত্রেরই এক অমোঘ পরিণতি — যেখানে ঘসেটি বেগম তাঁর ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, জগৎশেঠ-রায়দূর্লভ তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থ, উমিচাঁদ তাঁর প্রতারণা আর মীর জাফর তাঁর নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে বাংলার কপালে লিখেছিলেন এই শ্মশানযাত্রার প্রথম অক্ষর।

উপসংহার: ইতিহাসের অবিনাশী শিক্ষা
ইতিহাসের শিক্ষা বড়ই নির্মম। পলাশী থেকে মন্বন্তর— এই দীর্ঘ পথটি আমাদের শেখায় যে, যখন দেশের নেতৃত্ব বা সমাজের চালিকাশক্তি নিজেদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিগত লোভে অন্ধ হয়, তখন একটি সম্পদশালী জাতিও মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে।
সিরাজের পতন ত্বরান্বিত করতে ঘসেটি বেগমের সিংহাসনলিপ্সা যেমন কাজ করেছিল, তেমনি উমিচাঁদের দ্বিচারিতা আর জগৎশেঠ-রায়দূর্লভের বণিক স্বার্থপরতা ইংরেজদের পথ সুগম করে দেয়। মীর জাফররা যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়— কখনো ক্ষমতাপিপাসু ঘসেটি বেগম, কখনো প্রতারক উমিচাঁদ, কখনো স্বার্থান্বেষী জগৎশেঠ, কখনো বা নীরব রায়দূর্লভ। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডের ফলাফল সবসময় একই থাকে— জাতির পরাধীনতা ও দুর্দশা।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাই এই ইতিহাস কেবল পাঠ্যপুস্তকের তথ্য নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভেতরকার ‘বিভীষণ’দের চেনার এক অবিরাম সতর্কবার্তা।
মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার


মন্তব্য করুন

ব্লগ