সিনিয়র শিক্ষক
১৩ মে, ২০২৬ ০৯:৪৩ অপরাহ্ণ
শিক্ষকতার মর্যাদা ও প্রচারণার বিড়ম্বনা: একটি আত্মজিজ্ঞাসা
শিক্ষকতার মর্যাদা ও প্রচারণার বিড়ম্বনা: একটি আত্মজিজ্ঞাসা
সভ্যতার ইতিহাসে কিছু পেশা আছে, যেগুলো কেবল জীবিকা নয়—একটি নৈতিক দায়িত্ব, একটি আলোকিত ব্রত। শিক্ষকতা তেমনই এক মহান অঙ্গীকার। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষর শেখান না; তিনি গড়ে তোলেন মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের স্থপতি, সমাজের নীরব নির্মাতা—এই পরিচয়েই শিক্ষকতার আসল মর্যাদা নিহিত।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ শিক্ষকতার এই উচ্চ আসনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর সংস্কৃতি। কিছু অতিউৎসাহী ব্যক্তি ও চটকদার সংবাদপ্রবণতার কারণে শিক্ষকতার স্বাভাবিক মর্যাদা যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক ধরনের প্রচারণামূলক প্রদর্শনীতে। আর এই প্রবণতা একজন আত্মমর্যাদাশীল শিক্ষকের কাছে কেবল অস্বস্তির নয়, গভীর বেদনারও বিষয়।
অধিকার যখন ‘অনুদান’-এর ভাষা পায়
যেকোনো পেশাজীবীর কাছে বেতন তার শ্রমের আইনগত ও নৈতিক স্বীকৃতি। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা ব্যাংকার—কেউ বেতন পেলে তা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কারণ সেটি তাদের প্রাপ্য, কোনো অনুগ্রহ নয়।
কিন্তু শিক্ষক সমাজের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়—“বেতন ছাড়”, “অনুদানের চেক হস্তান্তর”, “শিক্ষকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ” ইত্যাদি শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কোথাও চেক হাতে তুলে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ছবি, কোথাও কৃত্রিম হাসিমাখা ফটোসেশন, আবার কোথাও সামান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমকেও বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এই উপস্থাপনাগুলো অজান্তেই একটি ভুল বার্তা দেয়—যেন শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা নয়, কারও বিশেষ দয়া বা করুণার দান গ্রহণ করছেন। ফলে “অধিকার” ধীরে ধীরে “অনুদান”-এর ভাষা পেয়ে যায়। আর সেখানেই মর্যাদার সংকট শুরু হয়।
প্রচারণামুখী মানসিকতা ও সংবাদ সংস্কৃতির সংকট
এই পরিস্থিতির পেছনে দায় এড়ানোর সুযোগ খুব কম। একদিকে আছেন কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, যারা সামান্য দাপ্তরিক কাজকেও ব্যক্তিগত কৃতিত্বে রূপ দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে আছেন এমন কিছু সংবাদকর্মী, যাঁদের কাছে যেকোনো আনুষ্ঠানিকতা হয়ে ওঠে ‘সংবাদযোগ্য’ দৃশ্য।
ফলে শিক্ষকতার মতো একটি সম্মানজনক পেশাও কখনো কখনো প্রচারণার উপকরণে পরিণত হয়। হাতে চেক তুলে দেওয়ার ছবি, আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের সারি, কিংবা “শিক্ষকদের মুখে হাসি” ধরনের শিরোনাম—এসব দৃশ্য সাধারণ মানুষের মনে অস্বস্তিকর ধারণা জন্ম দেয়।
সমাজ তখন ভাবতে শুরু করে—শিক্ষকরা কি সত্যিই এতটাই অসহায় যে তাদের প্রাপ্যটুকুও বিশেষ আয়োজন করে দিতে হয়?
এই ধারণা শুধু অপমানজনকই নয়, ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ একটি পেশার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে মেধাবী তরুণরা ধীরে ধীরে সেই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শিক্ষকতা তখন আর স্বপ্ন নয়, বরং অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়।
গোপনীয়তা, পেশাদারিত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন
ব্যক্তির আর্থিক বিষয় সাধারণত ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রয়োজনীয় নোটিশ সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা অফিসিয়াল মাধ্যমে প্রকাশ করাই যথেষ্ট। সেটিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, আনুষ্ঠানিক হাসি আর সংবাদ শিরোনামের উপাদানে পরিণত করার মধ্যে কোনো পেশাদার সৌন্দর্য নেই।
একজন শিক্ষক চান—তার প্রাপ্য সম্মানজনক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পৌঁছাক। তিনি চান না তাঁর বেতন পাওয়ার খবর জনসমক্ষে এক ধরনের ‘ঘোষণা’ হয়ে উঠুক। কারণ একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় তার ব্যাংক হিসাব নয়; তার প্রকৃত পরিচয় তার জ্ঞান, তার আদর্শ, এবং তার শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে রেখে যাওয়া আলোর রেখা।
“কোন তারিখে বেতন পেলাম”—এটি কোনো জাতির গৌরবের সংবাদ হতে পারে না। গৌরবের সংবাদ হওয়া উচিত—কোন শিক্ষক নতুন গবেষণা করলেন, কে শিক্ষার্থীদের জন্য অভিনব শিক্ষাপদ্ধতি চালু করলেন, কিংবা কে প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সস্তা প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রয়োজন
শিক্ষক সমাজ করুণার পাত্র নয়; তারা জাতির বিবেক নির্মাতা। তাই শিক্ষকতার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এমন অপ্রয়োজনীয় প্রচারণা ও প্রদর্শনমূলক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
খবর হোক শিক্ষকের সৃজনশীলতা, গবেষণা, মানবিকতা ও শিক্ষার্থীদের সাফল্যের গল্প। সংবাদপত্রের শিরোনামে উঠে আসুক জ্ঞানচর্চা, উদ্ভাবন ও সমাজগঠনের অনন্য উদাহরণ—প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবর্তনের সূচনা শিক্ষক সমাজকেই করতে হবে। যখন শিক্ষক নিজেই আত্মমর্যাদার প্রশ্নে সচেতন হবেন, তখন আর কেউ শিক্ষকতাকে প্রচারণার হাতিয়ার বানাতে সাহস পাবে না।
কারণ শিক্ষক কখনো অনুদানের গ্রহীতা নন; তিনি সেই মানুষ, যিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন নীরবে, নিরলসভাবে, মর্যাদার দীপ্ত আলোয়।
মুফিদুল আলম
রামু,কক্সবাজার।
৫
৫ মন্তব্য