Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ মে, ২০২৬ ০৪:৫৬ অপরাহ্ণ

সোশ্যাল মিডিয়া কি সত্যিই পড়াশোনার শত্রু?

রাত ১১টা। পরদিন পরীক্ষা। বই খোলা সামনে, কিন্তু চোখ আটকে আছে ফোনের স্ক্রিনে। একটা রিল দেখতে গিয়ে কখন যে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, টেরই পাওয়া যায়নি।

এই দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিটা বাড়ির গল্প।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ১৩ কোটির বেশি। আর এর একটা বড় অংশই তরুণ শিক্ষার্থী, যারা দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কাটাচ্ছে Facebook, YouTube, TikTok আর Instagram-এ। প্রশ্ন হলো, এই সোশ্যাল মিডিয়া কি আসলেই পড়াশোনার ক্ষতি করছে? নাকি ব্যাপারটা আরও জটিল?

মনোযোগ ভাঙার বিজ্ঞান

সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন মানুষ সেখানে যতক্ষণ সম্ভব থাকে। "Infinite scroll", অটো-প্লে ভিডিও, নতুন নোটিফিকেশন, এগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত ডিজাইন।

মস্তিষ্ক যখন একটা নতুন নোটিফিকেশন দেখে, তখন সামান্য পরিমাণ ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যেটা আনন্দের অনুভূতি দেয়। এই ছোট্ট আনন্দের জন্যই বারবার ফোনে ঢু মারা হয়। পড়তে বসলেও মাথার এক কোণে থাকে, "কে কী কমেন্ট করল? কতটা লাইক পেল পোস্টটা?"

গবেষণা বলছে, একবার মনোযোগ ভেঙে গেলে পুরোপুরি ফিরে আসতে গড়ে ২৩ মিনিট লাগে। মানে একটা নোটিফিকেশন দেখার জন্য যদি মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় নষ্ট হয়, পড়াশোনার ক্ষতি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি।

শুধু ক্ষতিই কি?

এখানে একটা ন্যায্য প্রশ্ন আসে, সোশ্যাল মিডিয়া কি সব দিক থেকেই ক্ষতিকর?

না, তা বলা ঠিক হবে না।

YouTube-এ বাংলায় পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতের ক্লাস পাওয়া যাচ্ছে, যেটা একসময় ভাবাই যেত না। Facebook গ্রুপে শিক্ষার্থীরা নোট শেয়ার করছে, প্রশ্ন করছে, একে অপরকে সাহায্য করছে। অনেকে ফ্রিল্যান্সিং শিখছে, নিজের ক্যারিয়ার গড়ছে, একমাত্র ইন্টারনেটের সুবাদে।

সমস্যাটা সোশ্যাল মিডিয়া নিজে নয়। সমস্যাটা হলো নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার।

একটা ছুরি দিয়ে রান্না করা যায়, আবার ক্ষতিও করা যায়। দোষটা ছুরির নয়, ব্যবহারকারীর হাতের।

আসল সমস্যা কোথায়?

অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে পালাতে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে। যখন কোনো অধ্যায় কঠিন লাগে, মন বিক্ষিপ্ত থাকে, বা পড়তে একদমই ইচ্ছে করে না, তখন সহজ পথ হলো ফোন তুলে নেওয়া।

এটা আসলে "avoidance" বা এড়িয়ে যাওয়ার স্বভাব। সোশ্যাল মিডিয়া এই স্বভাবকে আরও সহজ করে দিচ্ছে, মাত্র।

তাছাড়া ঘুমের ক্ষতি একটা বড় ইস্যু। রাতে দেরি করে ফোন ঘাঁটলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে, ঘুম ঠিকমতো হয় না। পরদিন ক্লাসে মনোযোগ থাকে না, পড়া মাথায় ঢোকে না, এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়।

কী করা যায়?

পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত না। বরং কয়েকটা ছোট পরিবর্তন বড় ফারাক আনতে পারে।

নির্দিষ্ট সময় ঠিক করো। পড়ার সময় ফোন অন্য ঘরে রাখো বা "Do Not Disturb" মোড চালু করো। পড়া শেষ হলে নির্দিষ্ট ১৫-২০ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করো, এটাকে পুরস্কার হিসেবে দেখো।

স্ক্রিন টাইম দেখো। ফোনের সেটিংসে গেলে দেখতে পাবে দিনে কতক্ষণ কোন অ্যাপ ব্যবহার করছ। অনেকে দেখেন সংখ্যাটা নিজেই চমকে দেয়।

ঘুমের আগে ফোন নয়। ঘুমানোর অন্তত আধঘণ্টা আগে ফোন রেখে দাও। এই একটা অভ্যাস ঘুমের মান এবং পরদিনের মনোযোগ দুটোই উন্নত করে।

সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার বানাও। Entertainment-এর বদলে learning-এর জন্য ব্যবহার করো। ভালো শিক্ষামূলক চ্যানেল ফলো করো, অকাজের পেজ আনফলো করো।

শেষ কথা

সোশ্যাল মিডিয়া আধুনিক জীবনের বাস্তবতা, এটা কোথাও যাচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, এটা তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি তুমি এটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

যে শিক্ষার্থী সোশ্যাল মিডিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, সে একটা বাড়তি সুবিধা পায়। আর যে পারে না, সে নিজের সময় এবং মনোযোগ দুটোই হারায়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ