Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ মে, ২০২৬ ১০:৫৮ অপরাহ্ণ

প্রাথমিক শিক্ষার সংকট: দায় কার, শাস্তি কার?

প্রাথমিক শিক্ষার সংকট: দায় কার, শাস্তি কার?

সম্প্রতি ইউনিসেফের একটি গবেষণা এবং পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার এক কঙ্কালসার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। একদিকে সরকার বলছেন শিক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, অথচ ফলাফল সন্তোষজনক নয়। পঞ্চম শ্রেণির ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে বা মৌলিক দক্ষতায় দুর্বল—এই দায়ভার কার? যখন কোনো পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকে, তখন পুরো দায়ভার শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং 'তিন মাসে রিডিং পড়তে না পারলে বেতন বন্ধ'—এমন সিদ্ধান্ত কি আদেও বাস্তবসম্মত নাকি স্রেফ অদূরদর্শিতা?

সংকটের মূলে কী আছে?
ছবিতে প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ শিক্ষক সিলেবাস শেষ করার চাপে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক স্বল্পতা চরম পর্যায়ে; যেখানে ১২-১৩টি পদের বিপরীতে মাত্র ৪-৫ জন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চলছে। এর ওপর রয়েছে অবকাঠামো সংকট এবং শিখন-শেখানো উপকরণের অভাব। একজন শিক্ষককে কেবল শ্রেণিকক্ষেই নয়, বরং আদমশুমারি থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা বা বিবিধ প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত রাখা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষায় যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, তার মাত্র ১০ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করার মতো সম্মানজনক বেতন বা সুযোগ-সুবিধাও অপ্রতুল। এমন এক জরাজীর্ণ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে তিন মাসের মধ্যে জাদুকরী ফলাফলের প্রত্যাশা করা কি বিজ্ঞানসম্মত?

যুক্তি যখন অযৌক্তিক
যদি 'কাজ না হলে বেতন বন্ধ'—এই নীতিই রাষ্ট্রের একমাত্র দাওয়াই হয়, তবে তো অন্য সব খাতের চিত্রও বদলে যাওয়ার কথা। আসুন একবার ভেবে দেখি সেই পরিস্থিতির কথা:

১. যদি ছাত্ররা পড়তে না পারার জন্য শিক্ষকের বেতন বন্ধ হয়, তবে হাসপাতালে রোগী সুস্থ না হলে কি ডাক্তারের বেতন বন্ধ হবে?
২. দেশে চুরি-ছিনতাই বা অপরাধ না কমলে কি পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেতন বন্ধ হওয়া উচিত?
৩. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দেরি হলে বা ভুল বিচার হলে কি বিচারকের বেতন বন্ধ থাকবে?
৪. জনকল্যাণমুখী আইন প্রণয়নে ব্যর্থ হলে কি এমপি-মন্ত্রীদের বেতন বন্ধের নিয়ম করা হবে?
৫. এমনকি সরকারের অদূরদর্শী নীতি বাস্তবায়নের কারণে যদি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আমলা বা খোদ সরকারের বেতন বন্ধের দাবি কি অবান্তর?

যদি এই প্রতিটি ক্ষেত্রে বেতন বন্ধের নিয়ম প্রয়োগ করা হতো, তবে হয়তো দেশে কোনো ঝামেলাই থাকত না! কিন্তু রাষ্ট্র বা সমাজ এভাবে চলে না। সমস্যা যেখানে মূলে, সেখানে ডালপালা ছেঁটে কোনো লাভ নেই।

সমাধান কোন পথে?
শিক্ষাকে আমরা জাতির মেরুদণ্ড বলি, কিন্তু সেই মেরুদণ্ড তৈরির কারিগরদের আমরা সবসময় চাপের মুখে রাখি। ভয় দেখিয়ে বা আর্থিক দণ্ড দিয়ে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন:

  • শিক্ষক নিয়োগের শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা এবং শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজ থেকে মুক্তি দেওয়া।

  • বাজেট বাড়িয়ে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান দেওয়া।

  • শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করে মেধাবীদের এই পেশায় আসার পথ সুগম করা।

  • সিলেবাসের বোঝা কমিয়ে বাস্তবমুখী কারিকুলাম প্রণয়ন করা।

প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে হলে আগে শিক্ষকদের যথাযথ পরিবেশ দিতে হবে। অদূরদর্শী নীতি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারা এবং বিনিয়োগের সঠিক প্রয়োগই পারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করতে। দায়ভার কেবল শিক্ষকের নয়, বরং পুরো সিস্টেমের। তাই সিস্টেম সংস্কার না করে ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল খোঁজার মতোই বৃথা।

মন্তব্য করুন

ব্লগ