Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ মে, ২০২৬ ০১:৪৬ অপরাহ্ণ

শিশুর গেম আসক্তি ও পড়াশোনায় অনিহা: উত্তরণের উপায়

শিশুর গেম আসক্তি ও পড়াশোনায় অনিহা: উত্তরণের উপায়

  • বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির আশীর্বাদ যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ মা-বাবার প্রধান উদ্বেগের কারণ হলো—শিশুর ভিডিও গেম আসক্তি এবং পড়াশোনার প্রতি চরম অনিহা। এই সমস্যাটি কেবল একটি সাময়িক অভ্যাস নয়, বরং এটি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গেম আসক্তির কারণ ও লক্ষণ

  • শিশুরা কেন গেমের প্রতি এতোটা ঝুঁকে পড়ছে, তা বোঝা জরুরি। ভিডিও গেমের রঙিন জগৎ, চ্যালেঞ্জ এবং তাৎক্ষণিক 'রিওয়ার্ড' বা পুরস্কার পাওয়ার ব্যবস্থা শিশুর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়, যা তাকে বার বার খেলার নেশায় বুদ করে রাখে।

    আসক্তির কিছু সাধারণ লক্ষণ:

    • খেলার সময় নির্ধারণ করে দিলেও তা মেনে না চলা।

    • গেম খেলতে বাধা দিলে অতিরিক্ত মেজাজ দেখানো বা জেদ করা।

    • সামাজিক মেলামেশা বা খেলাধুলা কমিয়ে দেওয়া।

    • খাবার ও ঘুমের অনিয়ম করা।

    পড়াশোনায় অনিহার যোগসূত্র

    গেম আসক্তি এবং পড়াশোনায় অনিহা একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন একটি শিশু ভার্চুয়াল জগতের দ্রুতগতির উত্তেজনা অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন পাঠ্যবইয়ের স্থির কালো অক্ষরগুলো তার কাছে বিরক্তিকর ও একঘেয়ে মনে হয়। গেমের কাল্পনিক সাফল্যের তুলনায় পড়াশোনার দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল তাকে আকর্ষণ করতে পারে না। ফলে মনোযোগের অভাব দেখা দেয় এবং পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে শুরু করে।

নেতিবাচক প্রভাব

  • গেম আসক্তির ফলে শিশুরা কেবল পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে না, বরং তাদের স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের সমস্যা, পিঠে ব্যথা এবং স্থূলতা (Obesity) বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় একাকী গেম খেলার ফলে শিশুদের মধ্যে একাকীত্ব, বিষণ্ণতা এবং খিটখিটে মেজাজ তৈরি হচ্ছে, যা তাদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উত্তরণের উপায়: মা-বাবার করণীয়

  • এই সমস্যা থেকে শিশুকে বের করে আনা রাতারাতি সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও সঠিক পরিকল্পনা।

    1. রুটিন তৈরি করা: শিশুকে পুরোপুরি গেম থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখুন।

    2. বিকল্প বিনোদন: শিশুকে ডিজিটাল ডিভাইসের পরিবর্তে মাঠের খেলা, ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া বা সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করুন।

    3. একসাথে সময় কাটানো: মা-বাবাকে শিশুর বন্ধু হতে হবে। তাদের সাথে গল্প করা, একসাথে ঘুরতে যাওয়া বা ইনডোর গেম খেলার মাধ্যমে ডিভাইসের প্রতি তাদের আকর্ষণ কমানো সম্ভব।

    4. পড়াশোনাকে আনন্দময় করা: পড়াশোনাকে কেবল মুখস্থ করার বিষয় না বানিয়ে হাতে-কলমে শেখানোর চেষ্টা করুন। ছোট ছোট সাফল্যে শিশুকে প্রশংসা বা পুরস্কার দিন।

    5. নিজে উদাহরণ হওয়া: শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে। যদি মা-বাবা নিজেরা সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তবে শিশুকে ফোন থেকে দূরে রাখা কঠিন। তাই পরিবারের বড়দেরও ডিভাইসের ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।

উপসংহার

  • শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। গেমের নেশায় যেন তাদের এই মূল্যবান শৈশব হারিয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। প্রযুক্তিকে বর্জন নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারি। ভালোবাসা এবং সঠিক নির্দেশনাই পারে শিশুকে গেমের ভার্চুয়াল জগৎ থেকে ফিরিয়ে এনে পড়ার টেবিলে মনোযোগী করে তুলতে।


    দেওয়ান রেজাউল হাসান

সহকারী শিক্ষক

বারপাখিয়া রথীন্দ্রপাড়া সপ্রাবি

দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল।

মন্তব্য করুন

ব্লগ