Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ মে, ২০২৬ ০৭:৩৬ অপরাহ্ণ

পারমাণবিক শক্তি বিবরণী : অতিরিক্ত প্রথম পর্ব – তাপপারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চাভিলাষী গবেষণা

১৯০৫ সালে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এ্যলবার্ট আইনস্টাইন ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র প্রতিপাদন করেন। তাত্ত্বিকভাবে তখন থেকেই পারমাণবিক শক্তির যাত্রা শুরু। বস্তু বা পদার্থ এবং শক্তি যে দুটি ভিন্ন রূপ এবং পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায় – এই সূত্রের সাহায্যেই তা প্রথম প্রমাণিত হয়। পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটিই হল তার পরিমাণ। অতি অল্প পরিমাণ বস্তু থেকে যে বিপুল পরিমাণে শক্তি আহরণ করা যায়, তা ঐ সময়ে অচিন্তনীয় ছিলো। পারমাণবিক চুল্লি এই শক্তি আহরণ করেই মানব সভ্যতা বিকাশে অবদান রাখছে এবং প্রায় অফুরন্ত শক্তি ভাণ্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে, একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্র মানব সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবার মত ভয়াবহতার হাতছানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রথম পর্বে পারমাণবিক শক্তির সাধারণ ধারণা, পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা, পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং পারমাণবিক শক্তি উৎস হিসেবে পরিচিত অধিক ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিষয়বস্তু ছিলো সভ্যতার অগ্রগতিতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor)। তৃতীয় পর্বে ছিল পারমাণবিক অস্ত্র পরিচিতি, ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকারভেদ, গঠন, ও কার্যপ্রণালীর বিবরণ। চতুর্থ পর্ব ছিলো পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা ও পারমাণবিক অস্ত্র কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে তার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে। পঞ্চম ও শেষ পর্ব সাজানো হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস, বর্তমান পৃথিবীতে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ, অতীত থেকে বর্তমানের অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিস্ফোরকের তুলনামূলক শক্তিমাত্রার ধারণা এবং পারমাণবিক শক্তির ব্যাবহারের সাথে মানবজাতি তথা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত তথ্যাদি দিয়ে।

কিন্তু ইতোমধ্যে সমাপ্ত সিরিজটিতে দুটো অতিরিক্ত পর্ব সংযুক্ত করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত পর্ব দুটোর মূল উদ্দেশ্য – পারমাণবিক শক্তি সংশ্লিষ্ট অত্যাধুনিক এবং চোখ ধাঁধানো গবেষণার তথ্য সংযুক্ত করা। বর্তমানে পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। এমনকি আমাদের দেশেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। অপরদিকে পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়া প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে নক্ষত্রগুলোতে। আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে থাকা নক্ষত্র সূর্যেও ঘটে চলছে অনবরত এমন ফিউশন বিক্রিয়া। শুধুমাত্র কোটি ডিগ্রী তাপমাত্রার আয়নিত গ্যাসের মধ্যেই এই বিক্রিয়া ঘটা সম্ভব বলে একে তাপ-পারমাণবিক বিক্রিয়াও বলা হয়।

এই তাপ-পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়া কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করে সেখান থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির দুঃসাহসী পরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীগণ। তাপ-পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অবিশ্বাস্য গবেষণার সুবৃহৎ কর্মযজ্ঞ নিয়েই সাজানো হচ্ছে অতিরিক্ত প্রথম পর্ব।

ফিউশন বিক্রিয়ার প্রাথমিক ধারণা উল্লেখ করা হয়েছিল প্রথম পর্বের “পারমাণবিক বিক্রিয়া – ফিশন ও ফিউশন (Fission & Fusion)” অংশে। তাপ-পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস ফিউশনিত হয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে পরিণত হবে। আর ফিউশনের ফলাফল হিসাবে পাওয়া যাবে জ্বালানীর অনুপাতে অবিশ্বাস্য পরিমাণ শক্তি।
হাইড্রোজেন ‘পর্যায় সারণী’র একেবারে প্রথম মৌল। এর পারমাণবিক ভর সবচেয়ে কম অর্থাৎ সবচেয়ে হালকা মৌল হাইড্রোজেন। তাই এর মোট পারমাণবিক বন্ধন শক্তিও সবচেয়ে কম। একারণে অন্য যেকোনো মৌলের তুলনায় হাইড্রোজেনে সবচেয়ে কম তাপমাত্রায় ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানো সম্ভব। এজন্য তাপ-পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানী হিসেবে সবচেয়ে কার্যকরী ও কর্মদক্ষ (Efficient) হিসেবে বিবেচিত হয়েছে হাইড্রোজেনের ভারী আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম।

প্রকৃতিতে কোনো মৌলের মুক্ত পরমাণু পাওয়া যায় না। অন্তত দুটো পরমাণু মিলে অণু তৈরি করে বিরাজ করে। হাইড্রোজেন গ্যাসের অণুতেও দুটি পরমাণু থাকে। হাইড্রোজেন গ্যাসকে ১০,০০০ কেলভিন তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে গ্যাসের অণু ভেঙ্গে পরমাণুসমূহ বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্তভাবে বিরাজ করতে শুরু করে। তাপমাত্রা ১৫,০০০-২১,০০০ কেলভিনে উন্নীত করলে পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনের মধ্যকার বন্ধনও ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে এবং নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রন মুক্তভাবে বিচরণ করতে থাকে। তাপমাত্রা বাড়িয়ে ৫০,০০০-১,৫০,০০০ কেলভিনে নিয়ে গেলে গ্যাসের কোনো পরমাণু বিদ্যমান থাকে না। এ তাপমাত্রায় হাইড্রোজেনের সকল পরমাণুই ধনাত্মক আধানে আহিত নিউক্লিয়াস ও ঋণাত্মক আধানে আহিত ইলেকট্রনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে এবং পজেটিভ চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস ও নেগেটিভ চার্জযুক্ত ইলেকট্রন মুক্তভাবে উচ্চগতিতে ছোটাছুটি করতে থাকে। এ অবস্থায় এটি হাইড্রোজেন গ্যাসের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে না, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। একে পদার্থের চতুর্থ অবস্থা ‘প্লাজমা’ বলা হয়। প্লাজমাকে মুক্ত আয়নিত পারমাণবিক কণার স্যুপের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যখন মৌল প্লাজমা অবস্থায় পৌঁছে তখন নিউক্লিয়াস উন্মুক্ত হয় ফলে ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়া সম্ভব হয়। তাই পদার্থ প্লাজমা অবস্থায় না পৌঁছালে কোনভাবেই ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়।

হাইড্রোজেন প্লাজমা অবস্থায় গেলেই সেখানে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হয় না। কারণ তড়িৎ আধানের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করবে। নিউক্লিয়াস পজেটিভ চার্জযুক্ত। তাই প্লাজমাতে মুক্তভাবে বিচরণকালে দুটি নিউক্লিয়াস সর্বদাই একে অপরকে দূরে ঠেলে দেবে। একে রিপালসিভ অ্যাকশন বলা হয়। প্লাজমাতে আয়নিত পারমাণবিক কণা উচ্চগতিতে ছোটাছুটি করে। প্লাজমার তাপমাত্রা যত বেশি, কণার গতিশক্তিও তত বেশি। কিন্তু রিপালসিভ ফোর্সের কারণে সমধর্মী আধান পরস্পরের সংস্পর্শে আসে না। রিপালসিভ ফোর্সের বাঁধা পেরিয়ে দুটি নিউক্লিয়াসের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানোর জন্য নিউক্লিয়াসের গতিশক্তি রিপালসিভ এনার্জির চেয়ে বেশি হতে হয়। অর্থাৎ প্লাজমার তাপমাত্রা আরো বহুগুণ বাড়াতে হবে। ফিউশন রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেন প্লাজমাকে ফিউশনের জন্য ১৫ কোটি কেলভিন তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হবে। এতে প্লাজমাতে মুক্ত নিউক্লিয়াস যে গতিশক্তি অর্জন করবে তা রিপালসিভ ফোর্সের বাঁধাকে অতিক্রম করার জন্য উপযুক্ত। এই তাপমাত্রায় প্লাজমাতে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং দুটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস মিলে তথা ফিউশনিত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি করবে।
দুটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের ভরের সমষ্টি অপেক্ষা একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের ভর কিছুটা কম হয়। এই হারিয়ে যাওয়া ভরই ফিউশনের ফলে আইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc2 সূত্রানুযায়ী বিপুল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে আলোক ও তাপশক্তি আকারে নির্গত হবে। এরপর হাইড্রোজেন ফিউশনে উৎপন্ন এই তাপশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত Steam Turbine ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে।


মন্তব্য করুন

ব্লগ