Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ মে, ২০২৬ ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ডিগ্রির বাইরে জীবনদক্ষতা: সময়ের দাবি বাস্তবমুখী শিক্ষা


মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

 

বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার সংজ্ঞা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যেখানে ভালো ফলাফল, উচ্চ ডিগ্রি এবং সার্টিফিকেট অর্জনই একজন শিক্ষার্থীর সফলতার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ সেখানে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। আজকের পৃথিবীতে ডিগ্রি অর্জন তুলনামূলক সহজ হলেও জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার দক্ষতা অর্জন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে আমরা এমন এক প্রজন্ম দেখতে পাচ্ছি, যারা একাডেমিকভাবে দক্ষ হলেও বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ‘লাইফ স্কিল’ বা জীবনদক্ষতার গুরুত্ব এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে সময়ের অপরিহার্য দাবি।

শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ করা বা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, তাকে সঠিকভাবে বাঁচতে শেখায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় এই মৌলিক দিকটি অনেকাংশেই উপেক্ষিত। একজন শিক্ষার্থী হয়তো গণিত, বিজ্ঞান বা অর্থনীতিতে পারদর্শী, কিন্তু যখন তাকে বাস্তব জীবনের কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়—যেমন চাপ সামলানো, সম্পর্ক বজায় রাখা বা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া—তখন সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর কারণ হলো, তার শিক্ষাজীবনে এই দক্ষতাগুলোর চর্চা হয়নি।

লাইফ স্কিল বলতে বোঝায় এমন কিছু ব্যবহারিক দক্ষতা, যা একজন মানুষকে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে। এর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা, সময় ব্যবস্থাপনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহানুভূতি, সহনশীলতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনা। এই দক্ষতাগুলো কোনো নির্দিষ্ট বই পড়ে পুরোপুরি শেখা যায় না; বরং এগুলো অর্জন করতে হয় অভিজ্ঞতা, অনুশীলন এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ ক্রমেই ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। এর ফলে বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং সহমর্মিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ গুণগুলো ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো অনলাইনে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে, কিন্তু সামনাসামনি কথোপকথনে বা দলগত কাজে অংশ নিতে গিয়ে সে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এই বৈপরীত্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষাবিদরা এখন একমত যে, একজন মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত, যখন সে জানে কীভাবে সঠিকভাবে বাঁচতে হয়। এই উপলব্ধি থেকেই লাইফ স্কিল শিক্ষাকে এখন পাঠ্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জীবনদক্ষতার যে সূচকগুলো নির্ধারণ করেছে, তা স্পষ্টভাবে দেখায়—একজন শিক্ষার্থীকে শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না; তাকে আত্মউন্নয়ন, সহমর্মিতা, নিরাপত্তা সচেতনতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতার মতো গুণাবলিও অর্জন করতে হবে।

লাইফ স্কিলের গুরুত্ব অঞ্চলভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তবে কিছু দক্ষতা সর্বজনীনভাবে প্রয়োজনীয়। যেমন—সাঁতার জানা, প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা থাকা, বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার কৌশল জানা ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলে সাইক্লোন মোকাবিলা, শহরে অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্প থেকে সুরক্ষা, গ্রামাঞ্চলে সাপের কামড়ের প্রাথমিক চিকিৎসা—এসব বাস্তব জীবনদক্ষতা একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

শিশুদের ক্ষেত্রে লাইফ স্কিল অর্জন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শৈশবই হলো চরিত্র ও মানসিকতার ভিত্তি গঠনের সময়। একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি জীবনদক্ষতার মধ্যে রয়েছে—যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সৃজনশীল চিন্তা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সহনশীলতা। এই দক্ষতাগুলো একটি শিশুকে শুধু ভালো শিক্ষার্থীই নয়, বরং একজন সচেতন, দায়িত্বশীল এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইফ স্কিল শেখানোর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যেমন—দলীয় কাজ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ, সহযোগিতা, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে পরিবারকেও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করা—এসবই লাইফ স্কিল গঠনে সহায়ক।

বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। কেবল পরীক্ষামুখী শিক্ষা দিয়ে আমরা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবো না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। যেখানে তারা শুধু জ্ঞান অর্জন করবে না, বরং সেই জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার সক্ষমতাও অর্জন করবে।

সবশেষে বলা যায়, জীবনে সফলতা অর্জনের জন্য শুধু একাডেমিক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব জীবনের দক্ষতা বা লাইফ স্কিল। এই দক্ষতাগুলো একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী, সচেতন এবং দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই সময়ের দাবি হলো—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে রূপান্তর করা, যেখানে লাইফ স্কিল শিক্ষা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। কারণ, একটি দক্ষ ও মানবিক প্রজন্মই পারে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও টেকসই সমাজ গড়ে তুলতে।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ