Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ মে, ২০২৬ ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মুখস্থ বিদ্যার শিক্ষক, অদক্ষ প্রজন্মের নির্মাতা

একজন বিজ্ঞান শিক্ষক যদি পরীক্ষাগারে দাঁড়িয়ে একটি সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার নিরাপদ প্রদর্শনও করাতে না পারেন, কিংবা একজন আইসিটি শিক্ষক যদি কম্পিউটারের মৌলিক ইনপুট-আউটপুট ডিভাইস, অপারেটিং সিস্টেম, ফাইল ম্যানেজমেন্ট, বা ইন্টারনেট ব্যবহারের বাস্তব দক্ষতা না রাখেন—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: তিনি কি সত্যিই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, নাকি কেবল পাঠ্যবই পাঠক?

এটি কোনো ব্যক্তিগত সমালোচনা নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় তখনই ঘটে, যখন “বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা” ধীরে ধীরে “পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতি”-তে নেমে আসে। তখন শিক্ষক জ্ঞান নির্মাতা নন, তিনি হয়ে যান প্রশ্নব্যাংক নির্ভর ফলাফল ব্যবস্থাপক। শিক্ষার্থীও জ্ঞান অন্বেষণকারী নয়, হয়ে ওঠে মুখস্থকেন্দ্রিক পরীক্ষার্থী। এই কাঠামোয় বিজ্ঞান আর অনুসন্ধান শেখায় না, আইসিটি আর প্রযুক্তি শেখায় না—শুধু উত্তরপত্র পূরণ করতে শেখায়।

ফলাফল কী হয়?

প্রথমত, শিক্ষার্থীর মধ্যে ধারণাগত শূন্যতা তৈরি হয়। সে জানে “পানি H₂O”, কিন্তু জানে না কেন দূষিত পানি ফিল্টার করতে হয়। সে জানে “CPU কম্পিউটারের মস্তিষ্ক”, কিন্তু জানে না একটি ফাইল কপি, ইমেইল সংযুক্তি, বা অনলাইন ফর্ম সাবমিট কীভাবে করতে হয়। অর্থাৎ সে সংজ্ঞা জানে, প্রয়োগ জানে না; তথ্য জানে, দক্ষতা জানে না।

দ্বিতীয়ত, এই শিক্ষা পদ্ধতি দক্ষতাহীন সনদপ্রাপ্ত প্রজন্ম তৈরি করে। তারা পরীক্ষায় A+ পায়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যা সমাধান করতে পারে না। কারণ তাদের শেখানো হয়েছে উত্তর, শেখানো হয়নি চিন্তা। শেখানো হয়েছে সংজ্ঞা, শেখানো হয়নি বিশ্লেষণ। শেখানো হয়েছে কী লিখতে হবে, শেখানো হয়নি কীভাবে করতে হবে।

তৃতীয়ত, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদার ওপর। যখন সমাজ দেখে—শিক্ষার্থী সনদ পেয়েও অদক্ষ, ডিগ্রি নিয়েও অযোগ্য, তখন প্রশ্নটা শিক্ষার্থীর দিকে নয়, শিক্ষকের দিকেই ফেরত আসে। তখন শিক্ষককে আর জ্ঞানের কারিগর হিসেবে দেখা হয় না; দেখা হয় একটি ব্যর্থ উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে। এ কারণেই অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষককে কেবল সম্মান হারানোর ঝুঁকিই নয়, জবাবদিহিরও মুখোমুখি হতে হবে।

বিশ্বের উন্নত শিক্ষা মডেলগুলো—ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া—একটি বিষয়ে একমত: শিক্ষক শুধু বিষয় জানলেই যথেষ্ট নয়; শিক্ষককে বিষয়টি “করতে” জানতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষককে পরীক্ষণ জানতে হবে, আইসিটি শিক্ষককে বাস্তব প্রযুক্তি ব্যবহার জানতে হবে, গণিত শিক্ষককে যুক্তি নির্মাণ শেখাতে জানতে হবে। কারণ আধুনিক শিক্ষা তথ্য স্থানান্তর নয়, দক্ষতা স্থানান্তর।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু প্রতিষ্ঠানে এখনো বড় সমস্যা হলো—বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ হলেও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন হয় না। একজন বিজ্ঞান শিক্ষককে কতটি ল্যাব সেশন নিয়েছেন, কতটি ডেমো করিয়েছেন, কতজন শিক্ষার্থীকে পর্যবেক্ষণভিত্তিক শেখাতে পেরেছেন—এসব দিয়ে বিচার করা হয় না। একজন আইসিটি শিক্ষককে কতজন শিক্ষার্থীকে বাস্তবে ডকুমেন্ট তৈরি, স্প্রেডশিট, ইমেইল, কোডিং, বা ডিজিটাল নিরাপত্তা শেখালেন—তা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে শিক্ষকতা পেশায় জ্ঞানের চেয়ে সনদ, দক্ষতার চেয়ে পদ, আর অনুশীলনের চেয়ে মুখস্থতাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ একজন দুর্বল শিক্ষক শুধু একটি ক্লাস নষ্ট করেন না; তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তাশক্তি দুর্বল করেন। তিনি এমন শিক্ষার্থী তৈরি করেন, যারা পরীক্ষায় পাশ করলেও বাস্তবতায় ব্যর্থ হয়; চাকরি পেলেও সমস্যা সমাধানে অক্ষম হয়; প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও উদ্ভাবন করতে পারে না।

সুতরাং প্রশ্নটি কেবল “একজন শিক্ষক কী জানেন?”—এতটুকু নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো:
তিনি কি শেখাতে পারেন?
তিনি কি দেখাতে পারেন?
তিনি কি প্রয়োগ করাতে পারেন?
তিনি কি শিক্ষার্থীকে মুখস্থ থেকে দক্ষতায়, তথ্য থেকে বোধে, আর সনদ থেকে সক্ষমতায় নিতে পারেন?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে তিনি হয়তো শিক্ষক পদে আছেন—কিন্তু শিক্ষা দিচ্ছেন না।

আর যে শিক্ষা বাস্তব দক্ষতা তৈরি করে না,
সে শিক্ষা পরীক্ষায় নম্বর দেয়,
কিন্তু জীবনে বারবার ব্যর্থ করে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ