Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ মে, ২০২৬ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা: অভিশাপ নয়, আমাদের ব্যর্থতার দর্পণ

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা: অভিশাপ নয়, আমাদের ব্যর্থতার দর্পণ

চট্টগ্রাম—উত্তরাধিকার ও বাণিজ্যের নগরী। অথচ প্রতি বছর বর্ষার প্রথম ঝড়েই যেন এ শহর থমকে দাঁড়ায়। চোখের সামনে স্বপ্নের বন্দরনগরী রূপ নেয় এক অভিশপ্ত জলাভূমিতে।
বর্ষা এলেই আমরা কী করি?
সংবাদ কভার করি, সরবে চিৎকার করি—দেশ গেল, সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা, সরকারের অবহেলা। টকশোতে বসে হাজারো কথা বলি। কিন্তু একবারও কি ভাবি—ড্রেন জ্যাম করেছে কারা? মেয়র-সরকার, নাকি আমি? আপনি?
সত্যিটা যন্ত্রণাদায়ক: যেখানে-সেখানে পলিথিন ফেলি আমরা। ড্রেনের মুখ আমাদের কাছে ডাস্টবিন। খাল-ড্রেন জ্যাম করে তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে শহর ডুবিয়ে দেই আমরাই—অথচ আঙুল তুলে দেখাই শুধু প্রশাসনের দিকে।
যেভাবে নিজেরাই ডুবিয়ে ফেলছি নিজেদের শহর
১. পলিথিন ও প্লাস্টিকের মহামারী
আমরা যেখানে-সেখানে ফেলি পলিথিন। ড্রেন থেকে খাল—সব জায়গায় জমে আবর্জনা। এই পলিথিন মাটিতে মিশে না, পচে না। শত বছর পরেও বহন করবে আমাদের দায়িত্বহীনতার স্বাক্ষর। ফলে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হয়ে যায়।
২. ড্রেন মানেই ডাস্টবিন—এই বিষাক্ত মানসিকতা
আমাদের মধ্যে গেঁথে যাওয়া অভ্যাসটি সবচেয়ে ক্ষতিকর। অভিযোগ করতে গিয়ে আগে সেই ড্রেনের দিকে তাকাই না—আমার ফেলা পলিথিনটাই কি সেখানে আটকে নেই?
৩. পাহাড় কাটা ও বালুর অভিশাপ
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা। পাহাড় কাটার ফলে বৃষ্টির পানির সাথে নেমে আসা বালু ও মাটি ড্রেন, নালা এবং খালগুলো ভরাট করে ফেলে। এটি শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
৪. খাল-ড্রেনের অবৈধ দখল (এনক্রোচমেন্ট)
শহরের অনেক খাল ও ড্রেন অবৈধভাবে দখল হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্থাপনা, দোকানপাট ও ভবন নির্মাণ করে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নামার রাস্তা খুঁজে পায় না।
জলাবদ্ধতা মানে শুধু পানি নয়, বহুমাত্রিক দুর্যোগ
অর্থনৈতিক ক্ষতি: কোমরপানিতে আটকে পড়া গাড়ির ইঞ্জিন বিকল, নষ্ট পণ্যসামগ্রী, ব্যবসা-বাণিজ্যে অসহনীয় লোকসান।
প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা: খোলা ও অদৃশ্য ড্রেনে পড়ে মৃত্যু—নিত্যদিনের ঘটনা।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: জমা নোংরা পানিতে মশা-মাছি বংশবৃদ্ধি, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, টাইফয়েডসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব।
মানসিক ও সামাজিক অবক্ষয়: অনেকে সুযোগ বুঝে সেপটিক ট্যাংক খুলে দেয় রাস্তায়। বৃষ্টির পানি তখন বিষাক্ত ও দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে।
সমাধান: অভিযোগ থামিয়ে হাত গুঁজি
নগর সিটি করপোরেশন ও সিডিএ ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করছে, খাল খননের মেগা প্রকল্প চলছে (১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে)। কিন্তু যতক্ষণ না আমরা নিজেরা থামছি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করছি, ততক্ষণ স্থায়ী সমাধান অসম্ভব।
আমাদের দায়বদ্ধতা:
বর্জ্য শুধুমাত্র নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলব, ড্রেনে নয়।
পাড়ায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান গড়ে তুলব।
বৃষ্টির সময় সেপটিক ট্যাংক খোলা একেবারে বন্ধ করব—এটি আইন ও মানবতা উভয়ের লঙ্ঘন।
প্রতিবেশী কেউ ড্রেনে ময়লা ফেললে বারণ করব এবং সামাজিক চাপ সৃষ্টি করব।
পাহাড় কাটা ও খাল দখল দেখলে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন বা হটলাইনে রিপোর্ট করব।
সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখব।
উপসংহার
চট্টগ্রাম আমাদের অহংকার। এ শহরকে বারবার ডুবিয়ে রাখার অধিকার কারও নেই—আমাদের নিজেদেরও না।
মনে রাখবেন, আপনার আজকের ফেলে দেওয়া এক টুকরো পলিথিন কাল হয়ে ফিরতে পারে আপনার প্রিয়জনের প্রাণ কেড়ে নিয়ে।
তাই আসুন, অভিযোগের সুর নামিয়ে দায়িত্বের সুর চড়াই। সচেতন চট্টগ্রাম গড়ি। জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে নিজেরাই নিজের শহরকে মুক্ত করি।
“পরিষ্কার রাখো নালা, বাঁচো সুস্থে, বাঁচাও শহর।”
১-৫-২০২৬
মুফিদুল আলম
শিক্ষক
রামু, কক্সবাজার

মন্তব্য করুন

ব্লগ