সিনিয়র শিক্ষক
০১ মে, ২০২৬ ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
দেশপ্রেমিক প্রজন্ম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ
দেশপ্রেমিক প্রজন্ম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ
একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার জনসংখ্যা নয়, বরং তার আদর্শনিষ্ঠ ও সৎ নাগরিক। বর্তমান নৈতিক অবক্ষয় ও আত্মকেন্দ্রিকতার যুগে বারবার একটি প্রশ্ন উঠে আসে—কবে আমরা দেখতে পাব সেই প্রজন্মকে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বৃহত্তর কল্যাণকে জীবনের ধ্রুবতারা মনে করবে?
দেশপ্রেম কোনো ক্ষণিকের আবেগ বা মানচিত্রের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা নয়। এটি দেশের জন্য নিজের সর্বোচ্চটুকু নিবেদন করার এক অবিচল অঙ্গীকার এবং প্রতিদিনের শুদ্ধাচারের অভ্যাস।
শিক্ষাঙ্গন: যেখানে অঙ্কুরেই পচন ধরে
শিশুর মনে দেশপ্রেম ও নৈতিকতার বীজ বপনের প্রধান ক্ষেত্র হলো শিক্ষাঙ্গন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত আদর্শ নাগরিক গড়ার পবিত্র কারখানা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দলীয় রাজনীতির অশুভ ছায়ায় আজ এই আঙিনায় গভীর পচন ধরেছে। শিক্ষার্থীরা ‘সুনাগরিক’ হওয়ার আগেই পরিণত হচ্ছে দলীয় অনুগত সৈনিকে। হলে সিট, ফলাফল, এমনকি সাধারণ সুযোগ-সুবিধা পেতেও অনেক সময় দলীয় আনুগত্য দেখাতে বাধ্য হয় তারা। ফলে পড়াশোনা ব্যাহত হয়, ক্যাম্পাস অস্থির হয় এবং সৃজনশীল চিন্তার পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্য চর্চা হয়।
আমাদের প্রধান ও অনড় দাবি:
শিক্ষাঙ্গনকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত করা। ছাত্ররা রাজনীতি চর্চা করবে। তবে লেজুড়বৃত্তিক নয়।
ছাত্র রাজনীতি যদি গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যম হয়, তবে তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে, বাইরের রাজনৈতিক মাঠে চলুক। কোনোভাবেই যেন তা পাঠদান, পরীক্ষা ও অপরিণত মনকে কলুষিত না করে।
প্রজন্ম গড়ার তিন কারিগর
প্রথম কারিগর: পরিবার
মা-বাবার জীবনাচরণই সন্তানের প্রথম নৈতিক পাঠশালা। যে পরিবারে মিথ্যা, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান থাকে, সেই সন্তান সহজে অন্যায়ের স্রোতে গা ভাসাতে পারে না।
দ্বিতীয় কারিগর: শিক্ষক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু তথ্য সরবরাহ করে না, মানুষ গড়ে। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে অনুসন্ধিৎসা, জাতীয় চেতনা ও সততার বীজ বপন করেন। কিন্তু যখন শিক্ষক নিজেই দলীয় অন্ধত্বে আচ্ছন্ন থাকেন, তখন তাঁর হাতে গড়া প্রজন্ম সুস্থ দেশপ্রেম থেকে বঞ্চিত হয়।
তৃতীয় কারিগর: সমাজ ও গণমাধ্যম
ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যম তরুণদের দ্বিতীয় গৃহশিক্ষক। যখন সমাজ ও মাধ্যম সৎ মানুষকে উদযাপন করবে এবং দুর্নীতিবাজকে সমালোচনা ও বর্জন করবে, তখনই তরুণ প্রজন্ম ত্যাগ ও সততার আদর্শে উজ্জীবিত হবে।
আত্মজিজ্ঞাসা: আমরা কি প্রস্তুত?
আমরা যে দেশপ্রেমিক প্রজন্মের স্বপ্ন দেখি, তারা আমাদেরই সন্তান। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে আমরা নিজেরা কতটুকু আদর্শনিষ্ঠ?
ট্রাফিক আইন ভাঙি? অনৈতিক সুযোগ খুঁজি? ঘুষ দিয়ে কাজ উদ্ধার করি? অন্যকে নীতি শেখানোর আগে আয়নায় নিজেকে দেখা জরুরি। বিষাক্ত জমিতে সুস্বাদু ফল ফলে না। আদর্শহীন পূর্বসূরির হাত ধরে আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে ওঠা অসম্ভব।
দৈনন্দিন দেশপ্রেম: ছোট কাজের বড় প্রভাব
প্রকৃত দেশপ্রেম কোনো বিশেষ দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিদিনের শুদ্ধাচার:
শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় নকল করে না
শিক্ষক যখন বাণিজ্যের চেয়ে সত্যিকারের পাঠদানকে প্রাধান্য দেন
চিকিৎসক যখন অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা না দিয়ে রোগীর সেবায় নিয়োজিত হন
প্রকৌশলী যখন গুণগত মানে আপস করেন না
সাধারণ নাগরিক যখন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ান
উপসংহার
কাঙ্ক্ষিত দেশপ্রেমিক প্রজন্ম কোনো জাদুমন্ত্রে তৈরি হবে না। এটি একটি সুপরিকল্পিত, নিঃস্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফসল। আর এই প্রক্রিয়ার মূলে থাকতে হবে রাজনীতিমুক্ত, দূষণমুক্ত শিক্ষাঙ্গন। যে আঁতুড়ঘরে আগামীর নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, সেই স্থান যদি দলীয় রাজনীতির বিষে ভরে থাকে, তাহলে সব চেষ্টাই বৃথা যাবে।
আমাদের ছোট ছোট সৎ পদক্ষেপ, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই পারে একটি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক প্রজন্ম উপহার দিতে।
“দেশপ্রেম কেবল ক্ষণিকের আবেগ নয়, এটি একটি অভ্যাসের নাম—যা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের সততা, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ এবং রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের মধ্য দিয়ে।”
-মুফিদুল আলম
শিক্ষক ও লেখক
রামু, কক্সবাজার।
৫
৫ মন্তব্য