Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০২:১৪ অপরাহ্ণ

প্রযুক্তি নির্ভরতা: ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর, নাকি অদৃশ্য বাঁধন?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তি এখন শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। চোখ খুললেই দেখি স্মার্টফোন, কান পাতলেই শুনি ইন্টারনেটের রিংটোন। এক মুহূর্তের জন্যও কি আমরা এগুলো ছাড়া চলতে পারি? আমার তো মনে হয়, উত্তরটা 'না'। এই যে সর্বব্যাপী প্রযুক্তি, এটা কি সত্যিই আমাদের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে? নাকি এক অদৃশ্য শেকলে আমাদের বেঁধে ফেলছে, যা থেকে মুক্তির পথ নেই? সত্যি বলতে, প্রশ্নটা এখন লক্ষ কোটি টাকার।


একটা সময় ছিল, যখন ফোন মানেই তারযুক্ত যন্ত্র। ইন্টারনেট ছিল কল্পনারও অতীত। আজ? আজ আমাদের হাতের মুঠোয় গোটা দুনিয়া। এক ক্লিকেই পৌঁছে যাচ্ছি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। অনলাইন ক্লাস, ঘরে বসে অফিস, চিকিৎসা পরামর্শ  সব যেন ম্যাজিকের মতো হাতের কাছে চলে এসেছে। বিশেষ করে এই করোনাকালে আমরা তো দেখেছি, প্রযুক্তি ছাড়া মানব সভ্যতা একরকম পঙ্গু হয়ে যেত। শিক্ষা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, সবকিছুর চাকা সচল রেখেছে এই প্রযুক্তিই। গ্রামের এক ছোট ব্যবসায়ীও এখন ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে তার পণ্য শহরে পাঠাতে পারছে। কৃষকরা ফসলের দাম জানতে পারছে এক মুহূর্তেই, মধ্যস্বত্বভোগীদের ফাঁদ থেকে মুক্তি পাচ্ছে অনেকেই। এই পরিবর্তনগুলো চোখে পড়ার মতো, অস্বীকার করার উপায় নেই।


কিন্তু ছবির অন্য দিকটাও তো আছে। আমরা কি সবটা দেখি? যখন দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোনে ডুবে থাকি, ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে মাঝরাত পার করি, তখন কি একবারও ভাবি, এটা আমাদের জীবনের মান কতটা বাড়াচ্ছে? নাকি শুধু সময়ের অপচয়? শিশুরা এখন মাঠে গিয়ে খেলার বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায় ট্যাবলেটে। এতে তাদের শারীরিক গঠন যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সামাজিক দক্ষতাও কমছে। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে, খেলার সাথীদের মুখগুলো হয়ে উঠছে চেনা-অচেনা ইমোজি। এটা কি আদৌ কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ? আমি তো ভাবি না।


এই যে আমাদের লাগামহীন প্রযুক্তি নির্ভরতা, এর একটা মারাত্মক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। কলকারখানায় এখন মানুষ নয়, রোবট কাজ করে। ব্যাংক থেকে শুরু করে সরকারি দফতর, অনেক কাজই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সফটওয়্যার দিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তাহলে এত মানুষের কী হবে? যারা প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের ভবিষ্যৎ কী? নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, মানছি। কিন্তু যারা দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, তাদের কথা কে ভাববে? তাদের জন্য ভবিষ্যৎটা বড্ড ধূসর মনে হয় আমার কাছে।


আর ডেটার সুরক্ষা? ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা? একটা অ্যাপ ডাউনলোড করলেই আমরা যেন সব তথ্য উজাড় করে দিই। কে জানে কোথায় যাচ্ছে আমাদের নাম, ঠিকানা, ছবি, এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস? সাইবার অপরাধীরা ওঁত পেতে আছে। সামান্য অসাবধানতা, আর মুহূর্তেই সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকি। ব্যাপারটা কী ভয়ংকর, ভাবলে গা শিউরে ওঠে! সরকারগুলো ডেটা সুরক্ষায় নতুন নতুন আইন আনছে বটে, কিন্তু কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমার সংশয় আছে। বড় বড় কোম্পানিগুলো আমাদের তথ্য ব্যবহার করে নিজেদের পকেট ভরছে, আর আমরা রয়েছি এক ঘোরের মধ্যে।


উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই বিষয়টা আরও জটিল। তাদের জন্য প্রযুক্তি একইসাথে এক বিরাট সুযোগ এবং এক চরম ফাঁদ। একদিকে এটি যেমন অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর পথ দেখায়, অন্য দিকে ডিজিটাল বিভাজন তৈরি করে। যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানে, তারা এগিয়ে যায় অনেক দূর। আর যারা এর নাগাল পায় না, তারা আরও পিছিয়ে পড়ে। শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, কর্মসংস্থানে সবখানেই এই বিভাজন স্পষ্ট। গ্রামের দরিদ্র মানুষ, যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সামর্থ্য নেই, তারা আধুনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই ফারাকটা তো কমছে না, বরং আরও বাড়ছে।


আর সবকিছুর চেয়ে বড় কথা, প্রযুক্তি আমাদের মানবিকতাকে কেড়ে নিচ্ছে না তো? আমরা কি যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছি না? একজন বন্ধুর বিপদে এখন আমরা সরাসরি পাশে না দাঁড়িয়ে একটা আবেগঘন পোস্ট দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করি। রাস্তায় দুর্ঘটনা দেখলে ভিডিও করতে লেগে যাই, কিন্তু সাহায্য করার কথা ভাবি না। সহানুভূতি, সহমর্মিতা  এই মানবিক গুণগুলো যেন অনলাইন নোটিফিকেশনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। এটা আমার কাছে সত্যিই খুব উদ্বেগের কারণ।


তাহলে কি প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দেব? একদমই না। সেটা তো আর সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন একটা সুস্থ ভারসাম্য। আমাদের বুঝতে হবে, প্রযুক্তি শুধু একটা টুল, একটা যন্ত্র। এর ব্যবহার নির্ভর করে আমাদের উপর। আমরা যদি এর সদ্ব্যবহার করি, তাহলে এটি সত্যিই উন্নতির সোপান। আর যদি লাগামহীনভাবে ব্যবহার করি, তাহলে এটিই আমাদের অদৃশ্য বাঁধনে জড়িয়ে ফেলবে।


সরকার থেকে শুরু করে পরিবার, সবারই এক্ষেত্রে ভূমিকা আছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাতে হবে। তাদের খেলার মাঠে যেতে উৎসাহ দিতে হবে, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে কেউ পিছিয়ে না পড়ে। ডেটা সুরক্ষায় কঠোর আইন আনা যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও ভীষণ দরকার।


আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এই প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগে আমাদের নিজেদের মধ্যে একটা "ডিজিটাল ডিটক্স" বা প্রযুক্তি থেকে বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। মাঝে মাঝে ফোনটাকে দূরে রেখে প্রকৃতির সাথে সময় কাটানো, প্রিয়জনদের সাথে গল্প করা, একটা বই পড়া এগুলো আমাদের মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনবে।


আসলে, প্রযুক্তি আমাদের দাস নয়, এটি আমাদের সহায়ক। এই সত্যটা মনে রাখলে আমরা হয়তো একটি উন্নত ও মানবিক ভবিষ্যৎ গড়তে পারব। তা না হলে, প্রযুক্তির এই মায়াজাল একদিন আমাদেরই গিলে ফেলবে, আর তখন সত্যিই আর ফেরার পথ থাকবে না। আরো  প্রযুক্তি সম্পর্কে  জানতে ভিজিট করুন: আমির ইনফো বাংলা

মন্তব্য করুন

ব্লগ