Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

“অধ্যাপক-অধ্যক্ষ-শিক্ষাবিদ পদবি’র যথেচ্ছ ব্যবহারে বিব্রত নাগরিক সমাজ”

“অধ্যাপক-অধ্যক্ষ-শিক্ষাবিদ পদবি’র যথেচ্ছ ব্যবহারে বিব্রত নাগরিক সমাজ”

শৃঙ্খলা স্বাধীনতার অন্যতম রক্ষাকবচ। শৃঙ্খলাহীন যথেচ্ছ আচরণ রীতিমতো বিব্রতকর। সম্প্রতি কিছু কিছু ব্যক্তির পদবি ব্যবহারে নাগরিক সমাজ বিব্রত ও বিভ্রান্ত। সমাজের সুপরিচিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিভ্রান্তিমূলক পদ-পদবি’র অপব্যবহার লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাস্তার পাশে ঝুলানো বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুনে শোভা পাচ্ছে। বর্তমানে প্রিন্সিপাল, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশিষ্ট সমাজ সেবক পদগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। কিছু ব্যক্তি কোন বেসরকারি কলেজ বা মাদ্রাসায় কিছুদিন পাঠদান করে নামের পূর্বে ‘অধ্যাপক (প্রফেসর)’ পদবি ব্যবহার করছেন। অথচ বেসরকারি কলেজে ‘অধ্যাপক (প্রফেসর)’ নামে আদৌ কোন পদ নেই, এটা শুধুমাত্র বিশ^বিদ্যালয় এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য। আমরা জানি, যখন একজন শিক্ষক বেসরকারি কলেজে যোগদান করেন তখন তাঁর পদ হলো প্রভাষক (৯ম গ্রেড)। এমপিও নীতিমালা-২০২১ এবং ২৮ অক্টোবর ২০২৫ এর পরিপত্র অনুযায়ী বেসরকারি কলেজের গুঁটিকয়েক প্রভাষক ৮ বছর সন্তোষজনক চাকরিকাল অতিবাহিত করে ৯ টি মানদ-ের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী অধ্যাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী বাকিরা ১৬ বছর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করবেন, বেসরকারি কলেজে আর কোনো পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই। অপরদিকে সরকারি কলেজের ক্ষেত্রে ৫ বছর পর প্রভাষক (৯ম গ্রেড) থেকে সহকারী অধ্যাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড); পরবর্তী ৩ বছর পর সহযোগী অধ্যাপক (৫ম গ্রেড) এবং সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ২ বছর পর অধ্যাপক বা প্রফেসর (৪র্থ গ্রেড) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে দুই-তিন গুণ বেশি  সময় লেগে যায়। প্রত্যেক পদোন্নতিতে সন্তোষজনক চাকরিকাল, বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণা এবং প্রকাশনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতি নীতিমালার উপর ভিত্তি  করে প্রভাষক থেকে প্রফেসর বা অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দও নিয়মানুযায়ী পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক পদ অর্জন করেন, অথচ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সমাজের সুপরিচিত কিছু ব্যক্তি দেদারসে ৪র্থ গ্রেডের ‘প্রফেসর (অধ্যাপক)’ পদটির অপব্যবহার করায় নাগরিক সমাজ বিব্রতবোধ করছেন। 

আমরা জানি ‘অধ্যক্ষ বা প্রিন্সিপাল’ পদটি উচ্চমাধ্যমিক (৫ম গ্রেড), স্নাতক বা স্নাতোকোত্তর (৪র্থ বা ক্ষেত্র বিশেষে ৩য় গ্রেড) কলেজ প্রধানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়; মাদ্রাসা প্রধানের পদবি হলো ‘সুপার’, আর আলিম থেকে কামিল মাদ্রাসা প্রধানের পদবি হলো - অধ্যক্ষ । কিন্তু এই পদগুলো এমন কিছু প্রতিষ্ঠান প্রধান ব্যবহার করছেন; যারা আদৌ এই পদের আওতাভুক্ত নন। ব্যক্তি মালিকানাধীন স্কুল, কিন্ডার গার্টেন স্কুল বা সমমান মাদ্রাসার প্রধানগণ নামের পূর্বে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে ‘প্রিন্সিপাল বা অধ্যক্ষ’ পদবি ব্যবহার করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। কিছুকিছু প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে নামসর্বস্ব স্কুল এন্ড কলেজ লেখা হচ্ছে, অথচ বাস্তবে সেখানে কলেজ শাখা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমোদনও নেই; কলেজ অনুমোদন তো বহু দূরের ব্যাপার। জানা মতে, এমপিওভূক্তির আশায় যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে অনাগ্রহ প্রকাশ করে নতুনভাবে আর কোনো স্কুল বা কলেজ অনুমোদন অথবা এমপিওভুক্ত না করার ব্যাপারে পূর্বেই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ‘অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল)’ পদবির অপব্যবহারে সরকারি-বেসরকারি কলেজ প্রধানগণ চরমভাবে অপমানিত ও বিব্রতবোধ করছেন। অথচ সরকারি বা বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল) পদ লাভ করতে হলে একজন শিক্ষককে কতই না দক্ষতা অর্জন করতে হয়, কতই না প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়! 

এবার আসি ‘শিক্ষাবিদ’ প্রসঙ্গে। বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে, শিক্ষাবিদ- হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি শিক্ষাদানের নীতি ও পদ্ধতি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান রাখেন এবং একজন শিক্ষকও বটে। ‘শিক্ষাবিদ’ একটি সম্মানজনক উপাধি ও শিক্ষায় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। দেশ-বিদেশের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিশেষ কোন বিষয়ের উপর গবেষণায় উত্তীর্ণ এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে শিক্ষাবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়; যার গবেষণাকর্ম স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত হয় এবং যিনি গবেষণাধর্মী পুস্তকের লেখক। বর্তমানে উদ্বেগজনকহারে ‘শিক্ষাবিদ’ নামক সম্মানসূচক পদবি যত্রতত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। স্বীকৃতি না থাকলেও রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে নামের পূর্বে নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’, ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবি সচরাচর চোখে পড়ছে। তাছাড়া হযরত মাওলানা, বিশিষ্ট সমাজসেবক নামীয় পদবি মুড়ি-মুড়কির মতো অপব্যবহার হচ্ছে। এজন্য শিক্ষিত সমাজ অসহায়ের মতো বিব্রত ও মনোকষ্টে ভুগছেন। উপর্যুক্ত পদ-পদবি’র অপব্যবহার রোধে সর্বসাধারণকে সতর্ক করার জন্য প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।   




মন্তব্য করুন

ব্লগ