Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সোনাদিয়ার পথে: নীল জলরাশি আর এক পচা ক্ষত

সোনাদিয়ার পথে: নীল জলরাশি আর এক পচা ক্ষত


গত শুক্রবারের সকাল ছিল কুয়াশায় মোড়া, স্নিগ্ধ ও নীরব। ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক ছয়টা ছুঁয়েছে, তখন আমরা সাতজনের একটি ছোট দল চৌফলদন্ডি ঘাটে জড়ো হলাম। গন্তব্য—সমুদ্রবেষ্টিত নির্জন দ্বীপ সোনাদিয়া। পরিকল্পনা ছিল ট্রলারে সরাসরি যাওয়ার, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথ দেখাল। ট্রলারের অভাবে আমরা কক্সবাজারের দিকে রওনা দিলাম। সেখান থেকে স্পিডবোটে চড়ে উত্তাল ঢেউ চিরে পৌঁছালাম মহেশখালী ঘাটে।
ঘাটে নেমে দেখি, আরও দুজন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। দল তখন নয়জনের। সেখানেই পরিচয় হলো আঠারো-উনিশ বছরের প্রাণোচ্ছল যুবক রফিকের সঙ্গে। তার চোখে কৌতূহল ও অভিযাত্রীর উচ্ছ্বাস ঝলকাচ্ছিল। সেও সোনাদিয়া যেতে চায় বলে জানাল। আমরা সানন্দে তাকে সঙ্গী করে নিলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই রফিক আমাদের দলের অপরিহার্য সহায়ক হয়ে উঠল। ট্রলারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়া হলো তাকে।
কিন্তু নদীতে তখন ভাটা। কোনো মাঝিই ট্রলার ছাড়তে রাজি নন। সবার একই কথা—কমপক্ষে দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।
রফিক নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যে ঢাকা থেকে আসা ছয়জনের আরেকটি দল এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। সব মিলিয়ে আমরা তখন ষোলোজন। তীব্র রোদে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছিল। একটু ছায়ার খোঁজে আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম নির্মাণাধীন একটি ব্রিজের বিশাল পিলারের নিচে।
কিন্তু সেই পিলারের গায়ে চোখ পড়তেই আমার শরীর শিউরে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড গভীরভাবে তাকিয়ে থাকার পরই স্পষ্ট হয়ে উঠল—এটি কোনো নিরাপদ কাঠামো নয়, বরং কয়েকশ টন কংক্রিটে দাঁড়ানো এক বিপজ্জনক মরণফাঁদ। রডগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত ল্যাপিং নেই, রিংবিহীন ফাঁপা ফ্রেম স্পষ্ট, আর কংক্রিটের ঢালাই খসে পড়ে ভেতরের দুর্বলতা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। পুরো কাঠামোটি যেন দুর্নীতি ও অবহেলার নগ্ন প্রতীক—যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। চিৎকার করে উঠলাম, “সবাই সরে আসুন! দ্রুত এখান থেকে বেরিয়ে আসুন!”
বলেই দৌড় দিলাম। আমার এই আকস্মিক আচরণে বাকি পনেরোজনও কিছু না বুঝে আমার পিছু নিল। বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে থামতেই সবাই অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে স্যার?”
“ওখানে কী দেখলেন?”
ঢাকার দলের একজন হালকা আতঙ্ক নিয়ে বললেন, “ভূত-টুত কিছু দেখেছেন নাকি?”
আমি তখনো হাঁপাচ্ছি। কাঁপা হাতে পিলারের দিকে ইশারা করে বললাম, “ওটা নিরাপদ নয়… ভেতরটা ফাঁপা। রডের অবস্থা ভয়াবহ। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।”
কথা শেষ হতে না হতেই তারা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
“এত বড় প্রকল্প! কোটি টাকার ব্রিজ! এটা ভেঙে পড়বে?”
“রোদে মাথা গরম হয়ে গেছে স্যারের!”
তাদের হাসির মাঝে আমি একা হয়ে গেলাম। কিন্তু আমার চোখের সামনে তখনো ভাসছিল সেই উন্মুক্ত রড আর খসে পড়া কংক্রিটের স্তর। আমি আর সেখানে দাঁড়ালাম না। তপ্ত বালুর ওপর একা বসে পড়লাম। অদ্ভুতভাবে, খোলা রোদ তখন সেই ছায়ার চেয়েও নিরাপদ মনে হচ্ছিল।
অবশেষে রফিক একটি জেলে নৌকার ব্যবস্থা করল। ইঞ্জিনের পরিচিত ‘ঢুকঢুক’ শব্দ তুলে নৌকাটি হেলেদুলে খালের গভীরে ঢুকে পড়ল। দু’পাশে ঘন সবুজ বাইন বন। গাছগুলো ডালপালা ছড়িয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। জোয়ারের টানে নৌকা যখন এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে থাকা খালপথ ধরে এগোচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন তার সমস্ত সৌন্দর্য উজাড় করে আমাদের বরণ করে নিচ্ছে। বাতাসে লবণাক্ত স্নিগ্ধতা, পানিতে রূপালি ঝিলিক।
কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ টিকল না।
একটি বাঁক ঘুরতেই চোখে পড়ল এক নির্মম দৃশ্য। একদল মানুষ বাইন গাছ কেটে ফেলছে। কেউ ব্যস্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণে। তাদের চোখে স্পষ্ট দখলের উন্মত্ততা। এখানে মাছের ঘের হবে, বাগদা চিংড়ির ‘কালো সোনা’ উৎপাদন বাড়বে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেন তাদের অভিধানে নেই।
বনের অস্তিত্ব তাদের কাছে শুধু বিপদ—বাঘ আসবে, কুমির আসবে, মানুষকে আক্রমণ করবে। তাই বন উজাড় করাই তাদের কাছে নিরাপত্তা।
বাইন গাছের শিকড় যখন মাটি থেকে উপড়ে ফেলা হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতি নিঃশব্দে তার গভীর বেদনা প্রকাশ করছে।
জোয়ারের টানে আমাদের নৌকার গতি বাড়ছিল। মাঝি-সহ আমরা সতেরোজন। বয়সে আমি সবার বড়। মাঝেমধ্যে নৌকা হেলে পড়ে পাশে লাগানো পাইপ দিয়ে স্বচ্ছ লবণাক্ত পানি ঢুকে পাটাতন ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সঙ্গীদের চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম—অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া না করলে বিপদ নেই।
শেষ বাঁক পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম সোনাদিয়ার সৈকতে।
নৌকা থেকে নামতেই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
সূর্যের সোনালি আভা নীল জলরাশির ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন কোনো অদৃশ্য শিল্পী আকাশ ও সমুদ্রজুড়ে রঙের অপূর্ব কারুকাজ এঁকেছেন। সামনে জেলেপাড়া—গাদাগাদি ঘর, সরু বালুময় পথ। আজ শুক্রবার। জুমার নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
একটি ছোট মসজিদের আঙিনায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পাশে একটি নলকূপ। চারপাশে লবণাক্ত পানির সমুদ্র—তবু এই দ্বীপের বুক চিরে উঠে আসছে মিঠা পানি। নির্মল, স্বচ্ছ, আশীর্বাদের মতো।
নামাজ শেষে আমরা এগোলাম সামনে। বালিয়াড়ি জুড়ে সারি সারি ঝাউ গাছ। সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে আসা বাতাস শীতলতা মেখে আমাদের স্পর্শ করছিল। দূরে ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডলফিনের দল লাফাচ্ছে। পায়ের নিচে সাদা মিহি বালু—চিনির গুঁড়োর মতো নরম। পরিষ্কার জল এসে পা ছুঁয়ে যাচ্ছে।
চারপাশে প্রায় নিস্তব্ধতা। শুধু ঢেউয়ের শব্দ, পাখির ডানা ঝাপটানো আর লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। বহু বছর পর এই দৃশ্য দেখে মনে হলো—প্রকৃতি এখনো কোথাও তার সৌন্দর্য আগলে রেখেছে।
কিন্তু এই নির্মলতাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
সৈকতের এক প্রান্তে চোখ আটকে গেল। কাছে গিয়ে দেখি—প্লাস্টিকের বোতল, বিস্কুটের মোড়ক, ছেঁড়া জাল, ভাঙা স্যান্ডেল ছড়িয়ে আছে। একটি মৃত পাখি পড়ে আছে—গলায় প্লাস্টিক আটকে শুকিয়ে গেছে। পায়ের কাছে পড়ে আছে একটি ব্যবহৃত সিরিঞ্জ।
রফিক নীরবে বলল,
“স্যার, আগে এই সৈকত কাচের মতো পরিষ্কার ছিল। এখন মানুষ আসে, খায়, ফেলে যায়। কেউ পরিষ্কার করে না।”
দুপুরের রোদ যখন মাথার ওপর, আমরা বালুর ওপর বসে রইলাম। কারো মুখে আর উচ্ছ্বাস ছিল না।
সকালের সেই দুর্বল পিলার, দুপুরের উজাড় হওয়া বন আর বিকেলের আবর্জনায় ঢেকে যাওয়া সৈকত—তিনটি দৃশ্য এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা। দুর্নীতি, লোভ আর অসচেতনতা—এই তিন শক্তি মিলে সৃষ্টি করেছে এক গভীর ক্ষত।
আমরা এসেছিলাম প্রকৃতির অমলিন রূপ খুঁজতে।
ফিরে যাচ্ছি এক অস্বস্তিকর সত্য বুকে নিয়ে।
বিকেল হওয়ার আগেই আমরা সোনাদিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
ফেরার পথে সূর্য ডুবছিল। আকাশ রক্তিম, জলরাশি তার প্রতিফলনে লালাভ। আমি হাত বাড়িয়ে বাতাস ছুঁতে চাইলাম—কিন্তু সেখানে কোনো স্নিগ্ধতা নেই, শুধু এক চাপা হাহাকার।
রফিক নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শুধু ঢেউয়ের শব্দ।
আর মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—
যখন কেউ ক্ষত দেখতে চায় না, তখন কি প্রকৃতি নীরব হয়ে যায়?
২৫-৪-২০২৬
মুফিদুল আলম
কক্সবাজার। 

মন্তব্য করুন

ব্লগ