Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দ- প্রভাব ও এর কারণ


কোন ভাষা কতখানি সমৃদ্ধ সেটা বহুলাংশে নির্ভর করে ভাষার শব্দসম্ভারের উপর। ভাষার শব্দসম্ভার আবার সেই ভাষাভাষী সমাজের জীবনব্যবস্থার উপর সর্বতোভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ কোন ভাষা যদি শব্দসমৃদ্ধ হয় তাহলে একথা নিরাপদে বলা চলে যে, সেই ভাষায় যাঁরা কথা বলেন তাঁদের সমাজও সে তুলনায় সমৃদ্ধ এবং অগ্রসর। ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক কারণে প্রাচীনকাল থেকে এদেশে বহু জাতির আগমন ঘটেছে। সে জাতির সাথে আদান-প্রদান ও সংমিশ্রণের ফলে তাদের ভাষার বহু শব্দ বাংলা ভাষায় গৃহিত হয়েছে। আর্য প্রভাবের ফলে বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডার সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ হয়। বাংলা ভাষা উৎপত্তির পরে আর্যরা ছাড়াও অন্যান্য ভাষা থেকে যেসব শব্দ এ ভাষায় এসেছে, সে আগন্তক শব্দগুলো হলো বাংলার ভাষায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দ।


◼️বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ফারসি শব্দের প্রভাব:


ষোড়শ শতকের শেষ পর্ব থেকে বাংলায় মোঘল শাসনের সূত্রপাতের পরে বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূলত বাংলায় মুসলিম শাসন আমল শুরু হলে এদেশে ফারসি শব্দের প্রচলন বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুঘলরা ফারসি ভাষায় কথা বলতো। যার ফলে অফিস আদালত থেকে শুরু করে সর্বস্তরে ফারসি ভাষার ব্যবহার প্রচলন শুরু হয়।


ড. পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের মতে, 'বাংলা ভাষায় প্রায় আড়াই হাজার ফারসি শব্দের ব্যবহার আছে।'


ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ফারসি হতে আগত শব্দগুলোকে বোঝার সুবিধার্থে সাত ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রতিটি ভাগের সাধারণ পরিচয় নিয়ে দেওয়া হলো-


১। রাজ্য, যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতি সম্বন্ধীয় শব্দ: নবাব, বেগম, ফৌজ, তির, তোপ, তত্ত্ব, বাদশাহ্, সুদ, তালুক, জখম, বাহাদুর, সেপাই, খেতাব, খাস, গুজুর, রসদ, রায়ত, খাজনা ইত্যাদি।


২। আইন-আদালত সংক্রান্ত শব্দ: নালিশ, মোকদ্দমা, তামাদি, মেয়াদ, আইন, কানুন, আদালত, মুন্সেফ, দারোগা, হাকিম, নাজির, পেয়াদা, উকিল, মোক্তার, সালিস, জরিমানা, জেরা, আসামি, ফয়সালা।


৩। ধর্ম সম্বন্ধীয় শব্দ: খোদা, নামায, রোযা, হজ, কোরবানি, জবাই, ফকির, দরবেশ, মোল্লা, মৌলভি, হারাম, জাহান্নাম ইত্যাদি।


৪। শিক্ষা সম্বন্ধীয় শব্দ : কাগজ, কেতাব, দোয়াত, খাতা, নকল, তরজমা, হরফ, মক্তব, মাদ্রাসা, কেচ্ছা, গজল, আদব ইত্যাদি।


৫। সভ্যতার উপকরণ সম্বন্ধীয় শব্দ: আচকান, আয়না, আতর, গোলাপ, বরফ, কালিয়া, পোলাও, চশমা, বাগান, মখমল, হালুয়া, পেস্তা, জামা, রুমাল, দালান, চশমা, কোরমা ইত্যাদি।


৬। জাতি ও ব্যবসাবচক শব্দ: ইহুদি, হিন্দু, ফিরিঙ্গি, কারিগর, যাদুকর, মেথর, ভিস্তি, কসাই, বাজিকর, চাকর, নফর, সহিস, খানসামা ইত্যাদি।


৭। সাধারণ দ্রব্য সম্বন্ধীয় শব্দ: আওয়াজ, হাওয়া, ওজন, কম বেশি, খবর, কোমর, বগল, গরম, জাহাজ, দরকার, পেশা, পছন্দ, মজবুত, হজম, সাদা, লাল, সবুজ, বাহবা, হুশিয়ার ইত্যাদি।


◼️বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি শব্দ: ত্রয়োদশ শতকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা দখলের মধ্য দিয়ে এদেশে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত ঘটে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদৌল্লার পতনের মধ্যদিয়ে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। মুসলিম শাসনের সময় প্রচুর সংখ্যক আরবি শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে। আরবি মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থের ভাষা হওয়ায় এদেশে আরবি শব্দের ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। বর্তমানে ফারসির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় বহু আরবি শব্দ ব্যবহার হচ্ছে। যেমন- আইন, আক্কেল, হকা, কেচ্ছা, খাসি, আয়েশ, বিদায়, জিলা, আতর, কেতাব, তাজ্জব, দফা, আদমি, এতিয়ার, উশুল, খাজনা, খারিজ, জমি, জমা, তহশিল, হিসাব, হিস্সা, আদালত, উকিল, দলিল, ফেরার, হাকিম, হেফাজৎ, আদব, কায়দা, কদম, দখল, হজম, সাফ; ইত্যাদি।


◼️বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তুর্কি শব্দ: ১২০৬ সালে বখতিয়ার খিলজি লক্ষণ সেনকে যখন পরাজিত করেন তখন তার সৈন্য সংখ্যা ছিল আঠারো জন। বখতিয়ার খিলজি সহ সবাই ছিল জাতে তুর্কি। বখতিয়ার খিলজির শাসনকালে বাংলায় কিছু তুর্কি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। ড. এনামূল হক সহ এদেশের কিছু খ্যাতনামা পণ্ডিতগণের ধারণা, খ্রিস্টীয় ৮ম-৯ম শতাব্দীতে বাঙালিরা আরব বণিকদের সংস্পর্শে আসে এবং পূর্ব-দক্ষিণ বাংলার চট্টগ্রামে উভয়ের সম্মতিতে একটি উপনিবেশ গড়ে ওঠে। যার ফলে আরবি- ফারসি শব্দের সাথে কিছু তুর্কি শব্দও বাংলা ভাষায় চলে এসেছে।


তুর্কি শব্দের কিছু নমুনা নিচে দেওয়া হলো:


আলখাল্লা, উজবুক, কাচি, কাবু, কুলি, চাকু, চিক, বিবি, বোঁচকা, খাতুন, খা, খানম, গালিচা, তবক, বাবুর্চি, বেগম, সওগাত, মুচলেকা, লাশ, তুরুক, দারোগা, কোর্মা ইত্যাদি।


◼️বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত পর্তুগিজ শব্দ:


ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাংলা ভাষায় পর্তুগিজ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। পর্তুগিজরা এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্য আসে। চট্টগ্রাম ও হুগলিতে তাদের বসতি ছিল। পর্তুগিজ শাসক Nonu da Cunha (১৫২৮-১৫৩৮ খ্রি.) সর্বপ্রথম বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করেন। ফলে বাংলা ভাষায় পর্তুগিজ ভাষায় বাণিজ্য সম্পর্কগত কিছু শব্দের প্রসার ঘটে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, বাংলা ভাষায় প্রায় শতাধিক পর্তুগিজ শব্দ ব্যবহার হচ্ছে।


বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কিছু গর্তুগিজ শব্দের নমুনা দেওয়া হলো: 


আলকাত্রা, আলপিন, কপি, কামরা, গামলা, গুদাম, চাবি, জানালা,


নিলাম, নোনা, পেরেক, ফিতা, বালতি, মার্কা, মাতুল, মিস্ত্রি ইত্যাদি।


◼️বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত মরাতিস এবং ওলন্দাজ শব্দ:


অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ফরাসি (ফ্রেঞ্চ) এবং ওলন্দাজ (ডাচ) এদেশে আগমন করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এলেও ইংরেজদের মতো এরাও কিছু কিছু রাজনৈতিক বিষয়ে এদেশে মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয়। তবে এদের রাজনৈতিক প্রভাব ইংরেজদের মতো সুদৃঢ় ছিল না। বিভিন্ন কারণে বাঙালিদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় বাংলা ভাষায় তাদের কিছু শব্দ প্রবেশ করেছে। তবে অন্যান্য ভাষার তুলনায় ফরাসি এবং ওলন্দাজ শব্দের পরিমাণ সামান্য।


◼️ফরাসি শব্দ :কার্তুজ, কুপন, দিনেমার, আলেমানে, কাফে, রেস্তোরা, আতাৎ ইত্যাদি।


◼️ওলন্দাজ শব্দ: হরতন, রুইতন, ইস্কাপন, তুরুপ, ইসকূপ, গাড়ির বোম ইত্যাদি।


◼️বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের প্রভাব: 


বাংলাদেশে ইংরেজদের আগমন ঘটে আষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে। তবে বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয় লাভ করার পর এদেশে ইংরেজের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা শুরু হয় এবং বলতে গেলে এখান থেকেই গোটা ভারতে তাদের সাম্রাজ্যের পত্তন আরম্ভ হয়। যার ফলে বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ছিল স্বাভাবিক একটি বিষয়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, প্রায় আট-নয়শত ইংরেজি শব্দ ইতিমধ্যে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষায় বহু ইংরেজি শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কিছু ইংরেজি শব্দ হলো- চেয়ার, টোস্ট, ট্রেন, রেল, মেল, সিনেমা, কফি, হোটেল, ফিল্ম, থিয়েটার, টেলিফোন, শার্ট, কোট, কোর্ট, স্কুল, কলেজ, স্টল, ডিপুটি, ফটো, ফোন; ইত্যাদি।


বিশ্বায়নের ফলে বাংলা ভাষায় আরো কিছু বিদেশি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য যেকোন কারণে বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে শব্দগুলো ব্যবহার হচ্ছে। যেমন-


◼️হিন্দি শব্দ: কাহিনি, খানাপিনা, চানাচুর, টইল, দাদা, নানা, পুরি, পানি, বার্তা, বাচ্চা, মিঠাই, সাচ্চা ইত্যাদি।


◼️গুজরাটি শব্দ: খদ্দর, জয়ন্তি, হরতাল ইত্যাদি।


◼️সিংহলি শব্দ: বেরিবেরি, সিডর ইত্যাদি।


◼️জাপানি শব্দ: জুডো, প্যাগোডা, রিকশা, হারিকিরি, হাসনাহেনা ইত্যাদি।


পাঞ্জাবি শব্দ: চাহিদা, শিখ ইত্যাদি।


◼️ইতালীয় শব্দ: মাফিয়া, ম্যাজেন্টা, সনেট ইত্যাদি।


◼️চীনা শব্দ: এলাচি, চা, লিচু, লবি, সাম্পান ইত্যাদি।


◼️গ্রিক শব্দ: কেন্দ্র, দাম, সুড়ঙ্গ ইত্যাদি।


মোহাম্মদ মনির উদ্দিন 
বি.এ.& এম.এ. ( চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) 
প্রভাষক,বাংলা।
রংগিয়াঘোনা মনছুরিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসা।
মন্তব্য করুন

ব্লগ