Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৪১ অপরাহ্ণ

​শৌর্য ও শিকড়ের আখ্যান: চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জব্বারের বলীখেলা

চট্টগ্রামের লালদিঘীর ময়দান মানেই বাঙালির বীরত্বগাথা আর মাটির টানে জেগে ওঠার এক অনন্য ইতিহাস। প্রতি বছর ১২ই বৈশাখ যখন বলীরা একে অপরকে জাপটে ধরেন, তখন কেবল পেশিশক্তির প্রদর্শন হয় না, বরং জেগে ওঠে শত বছরের পুরনো এক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। ১৯০৯ সালে আবদুল জব্বার সওদাগর যখন এই খেলার সূচনা করেছিলেন, তার লক্ষ্য কেবল বিনোদন ছিল না। সেই সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি যুবকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা এবং তাদের ভেতরে দেশপ্রেমের বীজ বপন করা ছিল এই আয়োজনের মূল অনুপ্রেরণা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই বলীখেলা আমাদের কেবল অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং আমাদের আত্মপরিচয় ও সাহসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

​এই উৎসবের প্রাণ হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং লৌকিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বলীখেলা উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল মেলাটি চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও কুটির শিল্পের এক বিশাল ক্ষেত্র। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কারিগরদের হাতে তৈরি মাটির সরা, বাঁশ-বেতের তৈজসপত্র আর লোকজ শৌখিন পণ্যগুলো আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী। আধুনিক নগরায়ণের যুগে যখন আমাদের লোকজ শিল্পগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। এটি এমন এক মিলনমেলা যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠে বাঙালির আদিম ও অকৃত্রিম উৎসবে।

​শিক্ষামূলক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে জব্বারের বলীখেলা বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি বড় পাঠশালা। এটি আমাদের নিয়মানুবর্তিতা, শারীরিক সক্ষমতার গুরুত্ব এবং ধৈর্য ধারণ করতে শেখায়। একইসাথে, বিদেশি সংস্কৃতির প্রবল জোয়ারে গা না ভাসিয়ে নিজের দেশীয় ঐতিহ্যকে বুক দিয়ে আগলে রাখার শিক্ষা আমরা এখান থেকেই পাই। বলীখেলা আমাদের শেখায় যে, সত্যিকারের লড়াই কেবল প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, বরং নিজের সংস্কৃতি ও সম্মানকে বিশ্বমঞ্চে সমুন্নত রাখা। তাই এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা এবং এর মূল চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। আমাদের এই গৌরবময় ইতিহাস টিকে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে রাখবে বলীদের সেই বীরত্বপূর্ণ হুংকার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ