Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:২৪ অপরাহ্ণ

প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে সমস্যা ও করণীয়


❇️❇️প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন: সমস্যা ও করণীয়❇️❇️

 

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না এমন বাক্য ছোট বেলা থেকেই আমরা বুঝে বা না বুঝে মুখস্থ করে এসেছি এবং এগুলো অতিশয় সত্য বাণীও বটে। আর এ মেরুদণ্ড যে কারখানায় তৈরি হয় তার নাম প্রাথমিক বিদ্যালয়।


একটি শিশু ভবিষ্যতে কতটুকু ন্যায় নীতিবান, আদর্শবান,চরিত্রবান হবে কিংবা দেশ, জাতি, সমাজের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল হবে এটি অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁর প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার উপর। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তাই অপরিসীম।


বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের কমবেশী সবারই জানা আছে। জাপানের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার সাথে আমাদের মৌলিক পার্থক্য হলো আমরা শুরুতেই বাচ্চাদের ঘাড়ে এক বোঝা বইয়ের ব্যাগ চাপিয়ে ভালো রেজাল্ট এর জন্য শিক্ষক অভিভাবক সবাই ছুটাছুটি করি। ফলে ভালো রেজাল্টধারী অনেক ছাত্র/ছাত্রী পাওয়া গেলেও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন ভাল মানুষের বড়ই অভাব। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এই অবস্থার পেছনে যেসব কারণ দায়ী তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হল।


(ক) নৈতিক শিক্ষার অভাব:❇️

প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের সিলেবাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানে নৈতিক শিক্ষা বা নীতি কথার চেয়ে তাত্ত্বিক কথা অনেক বেশী যা বাচ্চারা মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাশের জন্য। আবার পরক্ষণে তা ভুলেও যায়। আচরণগত শিক্ষা দেয়া হয় খুবই কম, এমনকি প্রতিদিন লাইনে দাঁড় করিয়ে যে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয় তার অর্থ হৃদয় দিয়ে কতজন ছাত্র ছাত্রী অনুভব করে তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে।


(খ) মান সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব ❇️

বলতে দ্বিধা নেই, যারা মানুষ গড়ার কারিগর, তাদের অনেকেরই নৈতিক মান নিয়ে অনেক খবর পত্র পত্রিকায় দেখা যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর মহান দায়িত্ব যাদের তারা শিক্ষকতা নামক মহান পেশাটিকে নেহায়েতই আয় রোজগারের একটি উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বা নিয়েছেন। এ অবস্থায় থেকে বের হওয়া খুবই জরুরী ।


(গ) শিক্ষকের অপ্রতুলতা ❇️

বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকের যে অনুপাত তা মানসম্মত শিক্ষার জন্য মোটেও উপযোগী নয়। প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এ অনুপাত ১:৫৩। এই অনুপাত কমিয়ে ১:২৫ এ আনা উচিত। অন্যথায় শিক্ষার আদর্শিক গুণগত মানে পৌছানো কখনোই সম্ভব হবেনা।


(ঘ) শিক্ষার পরিবেশের অভাব❇️

আদর্শবান জাতি গঠনের লক্ষ্যে সুস্থমেধা বিকাশ উপযোগী যে ধরনের শ্রেণি কক্ষ দরকার তা অনেক বিদ্যালয়েই অনুপস্থিত। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে বসার বেঞ্চ নেই, টয়লেট নেই, খেলার সামগ্রী নেই। যা প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে অত্যন্ত জরুরি।


(ঙ) দারিদ্র❇️

বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করছে। এসব পরিবারের মা-বাবারা মনে করেন তার সন্তান স্কুলে গিয়ে যে বৃত্তি পাবেন তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারবে বাসাবাড়ী বা বাইরে অন্য কথাও কাজ করে। ফলে তারা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ের চেয়ে জীবন জীবিকার কাজে নিয়োজিত করতেই বেশি পছন্দ করে। শিক্ষার সুদুর প্রসারী ফলাফল সম্পর্কে তাদের ধারণাও একবারেই কম।


(চ) ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্বলতা❇️

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি অন্যতম দায়িত্ব হলো শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসএমসির অনেক সদস্যই শিক্ষার গুরুত্ব বা গুনগত মান বৃদ্ধির বিষয়ে মোটেও সচেতন নয় । অনেকেই এসএমসির সদস্য হওয়াকে বা সভাপতি হওয়ার বিষয়টিকে সন্মান বৃদ্ধির/ক্ষমতা-আধিপত্য বৃদ্ধির/আয় রোজগার বৃদ্ধির উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শকে বিবেচনায় না এনে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদানকে বিবেচনা করার জন্য বাধ্যতা মূলক করা যেতে পারে ।


(ছ) অভিভাবকদের অসচেতনতা❇️

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু গ্রামে বসবাস করে এবং তারা কৃষি কাজে জড়িত, স্বাভাবিক ভাবেই তারা তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে তাদের মত কৃষক বানাতে চায়। তাদের অনেকের ধারণা, পড়ালেখা করে গরীব মানুষের সন্তানদের চাকরি পাওয়া কঠিন। তা ছাড়া শিক্ষার গুরুত্ব বা সুদুর প্রসারী ফল নিয়ে চিন্তা করার মত কল্পনা শক্তিও তাদের নেই।


প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে করণীয়:💥💥💥

প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে যে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত সেগুলো সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হল:


❇️ক) শুধু সিলেবাসভুক্ত পড়াশুনা না করিয়ে আদর্শ ভিত্তিক নীতি নৈতিকতা সম্পন্ন মানসিকতা তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।

❇️খ) চার বছর বয়সে স্কুলে গমন বাধ্যতামূলক করে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। ৬ বছর প্লাস হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান শুরু করতে হবে।

❇️গ) শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবী, চরিত্রবান ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে।

❇️ঘ) শিক্ষকদের পৃথক বেতন কাঠামো করে তাদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হবে।

❇️ঙ) ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনতে হবে।

❇️চ) শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের আরও বেশী সচেতন করতে হবে।

❇️ছ) প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাসে অন্তত ১ দিন একজন সফল ব্যক্তিত্বকে দিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের কে ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।

❇️জ) সর্বপরি, সুস্থ মেধা বিকাশে শিক্ষার পরিবেশ তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য তা নিশ্চিত করতে হবে।


পরিশেষে আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই যে, বিনয়ী, সৎ ও যোগ্যতা সম্পন্ন একটি জাতি গঠনের জন্য যে সব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো অবশ্যই একদিন দূর হবে এবং যে স্বপ্ন সাধ নিয়ে এই জাতির পথ চলা শুরু হয়েছিল তা অচিরেই পূর্ণ হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সেবাধর্মী একটি জাতি গঠনে সবাই কাজ করব-এই প্রত্যাশা রইল সংশ্লিষ্ট সবার কাছে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ