প্রধান শিক্ষক
১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৫০ অপরাহ্ণ
আজ চৈত্রসংক্রান্তি কাল পহেলা বৈশাখ
আজ চৈত্রসংক্রান্তি, বাংলা বছরের শেষ দিন। ঋতুরাজ বসন্তের বিদায় আর নতুন বছরের আগমনী সুরে আবহমান বাংলায় দিনটি উৎসব, আচার ও লোকজ আনন্দের এক অনন্য মিলনমেলা। একসময়কার গ্রামবাংলার এই উৎসব বর্তমানে প্রান্তিকতা থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও টিকে থাকলেও বদলে গেছে এর অর্থ, আদি আমেজ ও প্রেক্ষাপট।
অনেকের মতে, চৈত্রসংক্রান্তির অনুসরণেই এখনকার পহেলা বৈশাখের আয়োজন।
চৈত্রসংক্রান্তি মূলত একটি সংযোগের দিন। পুরনো বছরের সঙ্গে নতুন বছরের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, বিশ্বাসের সঙ্গে জীবনের। লোকাচার অনুসারে এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাসকে পুণ্যময় বলে মনে করা হয়।
তবে এর তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় নয়; বরং এটি ছিল কৃষিনির্ভর সমাজের গভীর জীবনবোধের বহিঃপ্রকাশ। ফলে ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির অনন্য অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামবাংলায় এখনো কোথাও কোথাও ছোট-বড় মেলা বসে। এসব মেলায় স্থান পায় বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী, মাটির খেলনা, বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও স্থানীয় পণ্যের পসরা।
শিশু-কিশোরদের ভিড়ে নাগরদোলা, লাঠিখেলা বা লোকগানের আসর মিলিয়ে এই উৎসব এখনো বহমান।
চৈত্রসংক্রান্তিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন পূজা-অর্চনা ও পার্বণ পালন করে। সংক্রান্তির আগের দিন পালিত হয় নীলপূজা। এ উপলক্ষে শিবের নীলকণ্ঠ রূপের স্মরণে মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় উপবাস ও প্রার্থনা করেন। আর মূল দিনে গ্রামবাংলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শিবের গাজন বা চড়কপূজা।
এসব আয়োজন একসময় শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। লোকজ ছড়া, গান ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে ধরা হতো মানুষের জীবনসংগ্রাম, আশা ও কষ্টের প্রতিচ্ছবি। তবে সময়ের পরিবর্তনে এসব আয়োজন এখন অনেক সীমিত।
চৈত্রসংক্রান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে খাদ্য সংস্কৃতি। একসময় লোকাচার অনুযায়ী এদিন ছাতু, চিড়া, দই, মুড়ি, খই, তিল ও নারকেলের নাড়ু খাওয়ার রীতি ছিল। দুপুরের খাবারে থাকত ১৪ রকম শাক। মাছ-মাংস পরিহার করে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার নিঃশব্দ এক বন্ধন। এসব রীতি ও আচার ক্রমেই কমে এলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। অন্যদিকে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পান্তা ও ইলিশের জনপ্রিয়তায় এখনো ভাটা পড়েনি।
প্রবীণদের মতে, আগে চৈত্রসংক্রান্তি মানেই ছিল দিনভর উৎসব, সন্ধ্যায় গানের আসর, আর মেলায় উপচে পড়া ভিড়। বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ এসে মিলিত হতো মেলায়। এর মাধ্যমে তৈরি হতো সামাজিক বন্ধন। এখনো সেসব আয়োজনের কিছুটা টিকে থাকলেও পাল্টে গেছে ধরন। মেলায় মাটির খেলনার জায়গায় ভাগ বসাচ্ছে প্লাস্টিকের খেলনা। বাঁশ-বেতের তৈরি তৈজসের প্রতি আগ্রহও কমছে।
বর্তমানে শহরকেন্দ্রিক উদযাপনে নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসছে চৈত্রসংক্রান্তি। তবে সেখানে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। বলা চলে শহুরে চৈত্রসংক্রান্তি অনেকটা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে পহেলা বৈশাখ বর্তমানে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নববর্ষের বহু বর্ণিল আয়োজনে বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হচ্ছে।
রাজধানীতে চৈত্রসংক্রান্তির আয়োজন : চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও শিল্পকলা একাডেমির পৃথক আয়োজন রয়েছে। বছরের শেষ দিনকে বিদায় জানাতে বরাবরের মতো চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হবে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ উৎসব। বর্ষ বিদায়ে থাকবে গান, নাচ, আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন।
এদিকে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন উপলক্ষে ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল পাঁচ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। প্রথম দিনের আয়োজনে অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তির দিন থাকছে অর্কেস্ট্রা, ধামাইল নৃত্য, জারিগান, পটগান ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংগীত-নৃত্য।
এবার বৈশাখী শোভাযাত্রায় বর্ষবরণ : পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় এবার ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ বাদ দিয়ে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এবারের পহেলা বৈশাখের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই শোভাযাত্রায় থাকছে গ্রামীণ জীবনের প্রতীক হিসেবে মোরগ ও সূর্য, যা নতুন দিনের সূচনাকে নির্দেশ করে। সাদা পায়রা তুলে ধরবে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বাউল সম্প্রদায়ের ওপর নানা ধরনের আক্রমণের প্রেক্ষাপটে সংহতির প্রতীক হিসেবে শোভাযাত্রায় রাখা হবে ‘দোতারা’।
০
০ মন্তব্য