সিনিয়র শিক্ষক
১১ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:১৮ অপরাহ্ণ
পাহাড়ের দীপ্তি: এক অনন্য জয়ের আখ্যান
পাহাড়ের দীপ্তি: এক অনন্য জয়ের আখ্যান
প্রিয় য়াপাও ম্রো,
তোমাকে হৃদয়ের গভীর থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। বাংলাদেশের প্রায় এক লক্ষ ম্রো সম্প্রদায়ের প্রথম নারী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তুমি শুধু নিজের নামই উজ্জ্বল করোনি, বরং একটি পুরো জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছ। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পাহাড় থেকে উঠে এসে সমাজতত্ত্ব বিভাগে মেধা তালিকায় স্থান অর্জন—এই সাফল্য শুধু তোমার একার পরিশ্রমের ফসল নয়, এটি হাজারো ম্রো মেয়ের অবদমিত স্বপ্নের সার্থক প্রতিফলন।
ম্রো সম্প্রদায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তারা পাহাড়ের সঙ্গে মিশে বেঁচে থাকে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবন চালায়। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুযোগের দিক থেকে তারা আজও অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে পাহাড়ের মেয়েদের জন্য শিক্ষার পথ বড় বেশি কণ্টকাকীর্ণ।
যেখানে স্কুলে যেতে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে যেতে হয়; কাদা আর পাহাড় মাড়িয়ে, নদীর স্রোত ডিঙিয়ে পৌঁছাতে হয় বিদ্যাপীঠে—সেখান থেকে উঠে আসা কতটা সংগ্রামের তা আমরা অনুধাবন করতে পারি। দূরের স্কুল, সামাজিক রক্ষণশীলতা আর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা যেখানে নিত্যসঙ্গী, এমন একটি প্রতিকূল পরিবেশ থেকে তুমি যেভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে মেধা তালিকায় প্রথম হয়ে ভর্তি হয়েছ, তা সত্যিই এক রূপকথার জয়।
কেন তোমার এই অর্জন এত বড়?
কারণ তুমি প্রমাণ করেছ—পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানরাও স্বপ্ন দেখতে পারে এবং সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। তোমার সাফল্য বলছে:
* দুর্গম পাহাড় আর শহরের দূরত্ব কেবল মানসিক, যা প্রবল একাগ্রতায় ঘুচিয়ে দেওয়া সম্ভব।
* লিঙ্গভেদ, জাতিগত পরিচয় বা অর্থনৈতিক অবস্থা কোনোটাই চূড়ান্ত বাধা নয়, যদি ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকে।
* একজন মেয়ের শিক্ষা শুধু তার নিজের ভাগ্য বদলায় না, পুরো পরিবার, সম্প্রদায় এবং প্রজন্মকে আলোকিত করে।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর হাজারো তরুণ-তরুণীদের জন্য তোমার এই যাত্রা একটি বার্তা বয়ে আনে: “তোমরাও পারবে। তোমাদের স্বপ্ন অসম্ভব নয়। শুধু বিশ্বাস রাখো এবং এক পা এক পা করে এগিয়ে যাও।”
অনুপ্রেরণার আলো ছড়িয়ে দাও
য়াপাও, তুমি এখন সমাজতত্ত্বের ছাত্রী। এই বিষয় তোমাকে শেখাবে সমাজ কীভাবে গড়ে ওঠে, ক্ষমতা, অসমতা ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে। তোমার নিজের সম্প্রদায়ের যাপিত জীবন এবং তোমার পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান মিলেমিশে এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে। হয়তো একদিন তুমি ম্রো সম্প্রদায়ের শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করবে, নীতি তৈরিতে অবদান রাখবে এবং অন্যদের পথ দেখাবে।
পিছিয়ে পড়া প্রতিটি ছেলে-মেয়েকে বলছি—য়াপাওয়ের মতো করে স্বপ্ন দেখো। বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করো। বাধা এলে তাকে সিঁড়ি বানাও। একজনের সাফল্য যখন সম্প্রদায়ের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে, তখন পরিবর্তন শুরু হয়।
য়াপাও ম্রো, তুমি শুধু প্রথম নও, তুমি একজন পথিকৃৎ। তোমার পথচলা অনেক মেয়েকে পাহাড় ডিঙিয়ে শহরের আলোয় পৌঁছাতে সাহায্য করবে। তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হোক, তোমার সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হোক।
অনেক অনেক অভিনন্দন ও শুভকামনা রইল। তুমি অনেক বড় হও, সমাজের জন্য আলো হয়ে উঠো।
তোমার একজন শুভানুধ্যায়ী
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়
রামু, কক্সবাজার।
৫
৫ মন্তব্য