Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৫৬ অপরাহ্ণ

গিরিংগার বিলাপ (ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক জলাধারের আত্মকথা)

গিরিংগার বিলাপ
(ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক জলাধারের আত্মকথা)

আমি গিরিংগা। 

একসময় আমি ছিলাম কালিরছড়া খালের উজানে জেগে থাকা এক প্রাণময় জলাধার — একটি চলমান স্রোতের জীবন্ত ইতিহাস, একটি সমগ্র জনপদের নিঃশ্বাস ও হৃদস্পন্দন। আজ আমি ধূসর, আজ আমি নীরব, আজ আমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমার বুক ফেটে যাওয়া বেদনার গভীর শব্দে লিখছি এই আত্মকথা।

আমার জন্ম কোনো এক নির্দিষ্ট দিনে হয়নি। আমি গড়ে উঠেছি সময়ের অতি ধীর গতিতে, বৃষ্টির কোমল স্পর্শে, পাহাড়ি ঢলের উষ্ণ মমতায়। একসময় আমি ছিলাম প্রবাহমান খাল। পরে মানুষের হাতের ছোঁয়ায় বদলে গেল আমার গতিপথ — আমি হয়ে উঠলাম এক বিস্তীর্ণ, প্রাণোচ্ছল জলাধার।

তখন আমার শরীর ছিল ঘন সবুজে ঢাকা। 
মোহনভিলা, গিরিংগা, লইয়াঘোনা, পুরারাস্তা, মিজ্জিরকোনা — এই নামগুলো ছিল আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো ছড়িয়ে থাকা প্রাণস্পন্দন। 

আমার চুল ছিল ঘন অরণ্যের ঘনত্ব, 
আমার কণ্ঠ ছিল জলজ পাখির অবিরাম মধুর গান, 
বুনো হাঁসের ঝাঁক ছিল আমার প্রিয় অতিথি, 
আর দেশীয় মাছের ঝাঁক — আমারই শিরায় প্রবাহিত রক্তকণিকা। 

আমি ছিলাম এই জনপদের গোপন স্বর্গ, প্রকৃতির নীরব দান।

বর্ষা এলে আমি ভরে উঠতাম আকাশভরা পানিতে। আমার বুকে জমা হতো বৃষ্টির সমস্ত আশীর্বাদ, আর সেই পানি নিঃশব্দে মাটির গভীরে চুঁইয়ে চুঁইয়ে যেত। মানুষ হয়তো জানত না — আমিই তাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে জাগিয়ে রাখতাম, বাঁচিয়ে রাখতাম।

একসময় রশিদনগর ও ঈদগাও ইউনিয়নের মানুষ মাত্র ২০–৩০ ফুট মাটি খুঁড়লেই পেয়ে যেত প্রাণের শীতল পানি। টিউবওয়েল কখনো শুকাত না। 
আমি প্রতি বছর ৩০০–৪০০ একর জমিতে সেচ দিতাম — ধানের শিষ সোনালি হয়ে ঝলমল করত আমারই জলের দয়ায়।

সেই সময় মানুষ আমাকে ভালোবাসত, সম্মান করত। 
বর্ষায় যখন আমি উপচে পড়তাম, তারা শুধু ভেসে আসা মাছ ধরত — আমার গভীরতার দিকে লোভী হাত বাড়াত না। 

সেই বিশ্বাস, সেই সংযম, সেই ভালোবাসা — আমাকে বহু বছর বাঁচিয়ে রেখেছিল।

তারপর এলো ২০১০ সাল। 

মানুষের ইতিহাসে হয়তো এটি একটি সাধারণ বছর। 
কিন্তু আমার জন্য — এটি ছিল নির্মম অভিশাপের সূচনা, ধ্বংসের প্রথম অধ্যায়।

মাত্র পাঁচ-ছয়টি প্রভাবশালী পরিবার। 
তাদের চোখে আমি আর কোনো প্রাণ ছিলাম না — ছিলাম শুধু বালি, মাটি, পাথর আর হিসাবের খাতার অঙ্ক।

ড্রেজারের ধারালো দাঁত নেমে এলো আমার নরম বুকে। নির্বিচারে, নিষ্ঠুরভাবে কেটে নেওয়া হলো আমার শিরা-উপশিরা। বালি আর পাথর লুট করে নেওয়া হলো; কিন্তু কেউ একবারও জিজ্ঞেস করল না — আমি কি মরতে রাজি আছি? 

পাহাড় থেকে কেটে আনা মাটি এনে ফেলা হলো আমার শরীরের উপর। আমার চারপাশের জমিগুলো ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠল, রক্তাক্ত হয়ে উঠল। 

হাজার হাজার মানুষের তীব্র প্রতিবাদ — থেমে গেল ক্ষমতার অন্ধ দেয়ালে। 
আইন যেন পাথর হয়ে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ বন্ধ করে।

মাঝে মাঝে কিছু সৎ ও সাহসী কর্মকর্তা এসেছিলেন। ড্রেজার জব্দ করেছিলেন, আশার আলো দেখিয়েছিলেন। 
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, খুব দ্রুতই তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বিদায় করা হয়েছিল। 

তারপর আবার শুরু হয়েছিল লুণ্ঠনের উৎসব, ধ্বংসের উৎসব।

আজ আমি আর নেই। 

যেখানে একসময় পাখির মধুর গান ভেসে আসত, সেখানে এখন শুধু ভয়ংকর নীরবতা জমে আছে। 
আমার পানি শুকিয়ে গেছে, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে। 

বৃষ্টি এলে এখন আর কেউ আমাকে থামাতে পারে না — 
জল সরাসরি বয়ে চলে যায় সমুদ্রের দিকে, কোনো বাধা ছাড়াই। 

আর মাটির নিচে? 
সেখানে এখন শুধু শূন্যতা আর শুষ্কতার রাজত্ব। 

যেখানে একসময় ২০–৩০ ফুট খুঁড়লেই প্রাণের পানি মিলত, 
আজ সেখানে ৮০–১২০ ফুট, এমনকি ১৫০ ফুট গভীরেও অনেক জায়গায় শুধু বাতাস আর শুকনো মাটি। 

টিউবওয়েলগুলো আজ নিঃশব্দ, মৃত। 
কৃষকের পাম্পে আর পানি ওঠে না — ওঠে শুধু হাহাকার, হতাশা আর অভিশাপ। 

সোনালি ধানের জমি আজ ধূসর মরুভূমি। 
উর্বর মাটি আজ শুধু অনুর্বর স্মৃতি হয়ে আছে। 

আমার মৃত্যুর সাথে সাথে হারিয়ে গেছে এই জনপদের জীবিকার শেষ ভরসা।

আমি ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে ভয় পাই। 

বর্ষায় যখন পাহাড় থেকে প্রবল ঢল নামবে — আমাকে আর পাবে না জল ধরে রাখার জন্য। 
তখন আসবে ভয়ংকর আকস্মিক বন্যা। 
আর শুষ্ক মৌসুমে — আসবে চরম, নিষ্ঠুর পানির সংকট। 

একদিন হয়তো শিশুরা প্রশ্ন করবে — 
“মা, এই মরুভূমির জায়গায় সত্যিই কি একদিন জল ছিল? পাখি ডাকত? মাছ খেলা করত?”

তাদের বলা হবে — 
একটা সময় ছিল, যখন এখানে গিরিংগা নামে এক জলাধার ছিল। 
যে নীরবে, নিঃশব্দে মারা গেছে মানুষের অসীম লোভ ও অন্ধত্বের কাছে।

শুধু তা-ই নয়। গতকাল সন্ধ্যায় আমার বিদীর্ণ, ক্ষতবিক্ষত বুকে বসে একটি গোপন মিটিং হয়েছে। 
ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাকে সম্পূর্ণ দখল করে নেবে। আমার বুকে খুঁটি গেড়ে ভাগ করে নেবে। তারপর হয়তো কোনো এক অমাবশ্যার অন্ধকার রাতে ২০-৩০টি ঘর উঠবে। আমার উপর শুরু হবে চিরস্থায়ী গ্রাম্য নির্যাতন, চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র।

তাই আমি আতংকিত। 
আমি চাই না, আর কোনো জলাধার আমার মতো এই নিষ্ঠুর মৃত্যুবরণ করুক।

তাই আমার ধ্বংসস্তূপ থেকে এই শেষ, জোরালো আহ্বান —

• গঠন করো একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি 
• গত চৌদ্দ বছরে যারা আমাকে লুট করেছে, ধ্বংস করেছে, তাদের প্রকাশ্যে চিহ্নিত করো ও শাস্তির আওতায় আনো 
• সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দাও এবং তাদের সুরক্ষা দাও 
• আধুনিক প্রকৌশল ও পরিকল্পনা দিয়ে আমার বুকে ফিরিয়ে আনো প্রাণবন্ত পানি 
• আমার পাড়ে গড়ে তোলো নতুন, ঘন বন ও সবুজায়ন 
• কঠোরভাবে, নির্মমভাবে বন্ধ করো সকল অবৈধ বালি উত্তোলন ও ড্রেজিং 

প্রকৃতি কাউকে কিছু বিনা মূল্যে দেয় না। 
আমি দিয়েছিলাম আমার সবটুকু — আমার পানি, আমার প্রাণ, আমার সৌন্দর্য। 

আজ তার প্রতিদান — 
তৃষ্ণা, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ফসলের ধ্বংস আর চরম পরিবেশ বিপর্যয়।

আমি গিরিংগা। 
আমি শুধু একটি জলাধার নই — 
আমি এক নিঃশব্দ, কিন্তু ভয়ংকর সতর্কবার্তা। 

আমার এই মৃত্যু একদিন সমগ্র অঞ্চলের বৃহত্তর পরিবেশ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।

তাই বলছি — 
জাগো। এখনই জাগো। 
কারণ সময় সত্যিই ফুরিয়ে আসছে। খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

✍️ — গিরিংগা 
(একসময়ের প্রাণময় জলাধার, আজ এক ধ্বংসস্তূপের যন্ত্রণাময় স্বর) 
📅 ৮ এপ্রিল ২০২৬


মন্তব্য করুন

ব্লগ